সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
আফগানিস্তানে নারীদের পোশাক ও চলাফেরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পর এবার রঙিন ওড়না পরা, মেকআপ করা কিংবা চুলের কিছু অংশ দেখা যাওয়ার অভিযোগেও নারীদের আটক করছে তালেবান কর্তৃপক্ষ। গত তিন মাসে দেশটির রাজধানী কাবুল ও পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত শহর থেকে অন্তত ৫২ নারী ও এক কিশোরীকে আটক করা হয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গত ৮ অক্টোবর আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশন (ইউএনএএমএ) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব নারী ও কিশোরীকে আটক করা হয়। তালেবান সরকারের নির্ধারিত পোশাকবিধি লঙ্ঘন এবং পুরুষ অভিভাবক ছাড়া জনসমক্ষে চলাফেরার অভিযোগে তাঁদের আটক করা হয়েছিল।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, আটক নারীদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা পোশাক না পরা, মাথার চুল দৃশ্যমান থাকা, রঙিন ওড়না ব্যবহার কিংবা মুখে মেকআপ করা। এ ছাড়া ‘মাহরাম’ বা নির্ধারিত পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে বের হওয়ার কারণেও কয়েকজনকে আটক করা হয়।
আটক ব্যক্তিদের কয়েক ঘণ্টা হেফাজতে রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হলেও এ ধরনের অভিযান নারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের আশঙ্কা, বাস্তবে আটকের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ভয় এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক নারী তাঁদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতন বা হয়রানির ঘটনা প্রকাশ করেন না।
শুধু আটক নয়, পোশাকবিধি কার্যকর করতে গিয়ে নারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, শারীরিক নির্যাতন এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নারী দোকানদারদের সঙ্গে এমন আচরণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের সহায়তা মিশন।
সংস্থাটির মতে, পোশাক ও ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ওপর এ ধরনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ নারীদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। এর ফলে স্বাধীনভাবে চলাফেরা, মতপ্রকাশ এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানের ক্ষমতা পুনর্দখলের পর থেকেই নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ জারি করে তালেবান সরকার। প্রথমে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় বাধা দেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়েও নারীদের পড়াশোনার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে আফগানিস্তানে মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ নেই। নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের গত আগস্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে আফগানিস্তানে ২৬ লাখের বেশি মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই নিষেধাজ্ঞা দেশটির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
নারীদের পোশাক নিয়ে তালেবান সরকারের কঠোর অবস্থান নতুন নয়। দেশটিতে জনসমক্ষে নারীদের শরীর ও মুখমণ্ডল ঢেকে রাখার বিধান কার্যকর রয়েছে। এসব নিয়ম বাস্তবায়নে দেশটির নৈতিকতাবিষয়ক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি চালায়।
এর আগে চলতি বছরের জুনে হেরাত শহরে নারীদের আটকের প্রতিবাদে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। সেই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত একজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ঘটনাটি আফগানিস্তানে নারীদের অধিকার ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
জাতিসংঘের সহায়তা মিশন জানিয়েছে, নারীদের পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নির্বিচারে আটক এবং হয়রানির মতো পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী। সংস্থাটি তালেবান কর্তৃপক্ষের প্রতি নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক অভিযান বন্ধ এবং তাঁদের মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা চললেও নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেনি তালেবান সরকার। ফলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ হারানোর পাশাপাশি এখন দৈনন্দিন পোশাক নির্বাচন এবং স্বাভাবিক চলাফেরার ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ছেন আফগান নারীরা।
সাম্প্রতিক আটকের ঘটনাগুলো আবারও সামনে এনেছে আফগানিস্তানে নারীদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সংকট। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ, এ ধরনের বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে দেশটির নারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন থেকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।
মন্তব্য করুন