নিউজ ডেস্ক
৫২ minutes আগে
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৯ জন

চুয়েটে ছাত্রদলের সমর্থন পেয়েও অবরুদ্ধ নতুন উপাচার্য, আন্দোলনের নেপথ্যে রাজনৈতিক ইন্ধন কতটা?

বিশেষ অনুসন্ধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪

চট্টগ্রাম | মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে চলমান আন্দোলন নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম, অন্যদিকে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ। সেই আন্দোলনে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাধিক সংগঠনের সমর্থন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, চুয়েটের সংকট কি শুধুই উপাচার্য পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ, নাকি এর পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক গোষ্ঠীর প্রভাবও কাজ করছে?

বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, বর্তমান ও সাবেক উপাচার্যের বক্তব্য, ছাত্রদল নেতাদের অবস্থান এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংকটের অন্তত দুটি স্পষ্ট পক্ষ তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ সরকারের নিয়োগ দেওয়া নতুন উপাচার্যকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে। অন্য পক্ষ অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে অনড়। এই বিরোধের মধ্যেই আওয়ামী লীগপন্থী সাবেক ছাত্রনেতা, ছাত্রশিবিরের কর্মী এবং শিক্ষকদের একটি অংশ আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রদলের নেতারা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গত ২১ সেপ্টেম্বর মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় চুয়েটের উপাচার্য পদ থেকে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয়। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচির কারণে বন্ধ রয়েছে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম।

নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের নিয়োগ সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হলেও আন্দোলনকারীরা শুরু থেকেই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ছাত্রদলের নেতাদের বক্তব্য, সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া একজন উপাচার্যকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না দিয়েই অপসারণের দাবি তোলা যুক্তিসংগত নয়।

ছাত্রদলের এই অবস্থান সোমবার (১২ অক্টোবর) আরও স্পষ্ট হয়। ওই দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদসহ কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করেন নতুন উপাচার্য। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করেন। রাত পর্যন্ত অবরোধ চলতে থাকে এবং ভবনের বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়।

### ছাত্রদলের অবস্থান: নতুন উপাচার্যকে কাজের সুযোগ দেওয়ার দাবি

চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ আন্দোলন প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। তবে সেই আন্দোলনের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর দাবি, আন্দোলনে অংশ না নেওয়া বা নতুন উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ চাপের মুখেও পড়েছেন।

ছাত্রদল নেতারা মনে করছেন, নতুন উপাচার্যের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও দক্ষতা মূল্যায়নের আগেই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারি নিয়োগের সিদ্ধান্তকে সমর্থন এবং দ্রুত স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ওয়াসিফ রাশেদ অবশ্য রাজনৈতিক কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির পক্ষ হয়ে নতুন উপাচার্যকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই প্রধান লক্ষ্য।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রদলের নেতাদের সমর্থন নতুন উপাচার্যের জন্য সাংগঠনিক সহায়তা তৈরি করেছে, কিন্তু এই সমর্থন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। বিপরীতে আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণও দৃশ্যমান। ফলে ক্যাম্পাসের সমর্থনের প্রকৃত অনুপাত নির্ধারণ করতে হলে নিরপেক্ষ জরিপ বা প্রতিনিধিত্বশীল মতামত গ্রহণ প্রয়োজন।

### আন্দোলনে ছাত্রশিবির ও আওয়ামী লীগপন্থীদের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ

চুয়েটের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে আন্দোলনের পেছনে সাংগঠনিক ইন্ধনের অভিযোগ নিয়ে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের এক নেতার বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধা পাওয়া কয়েকজন শিক্ষক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং ছাত্রশিবিরের সক্রিয় কর্মীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে ব্যবহার করে নতুন উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে।

এই অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্দোলন পরিচালনায় ছাত্রশিবিরের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নির্দেশনা, আর্থিক সহযোগিতা কিংবা অন্য কোনো সমন্বিত রাজনৈতিক পরিকল্পনার নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগপন্থী কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নতুন উপাচার্যকে অপসারণের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে আন্দোলন পরিচালনা করছে—এমন তথ্যও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তবে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং আন্দোলনে তাঁদের ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁদের অংশগ্রহণ স্বতন্ত্র মতপ্রকাশ, নাকি সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ। এই দুই বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।

অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁদের কর্মসূচিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ, উপাচার্য নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ব্যাখ্যা করছেন। তাঁদের দাবি, অধ্যাপক সায়েমের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণ না দেখিয়ে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

### নতুন উপাচার্যের বক্তব্য: রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রশাসনিক দায়িত্বই মুখ্য

নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম তাঁর নিয়োগকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার বিষয় নয়; এটি একটি আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

তাঁর বিরুদ্ধে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির অনুসারী হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে তিনি এই ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন এবং যাঁরা এসব অভিযোগ তুলছেন, তাঁদের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

অধ্যাপক শরীফুল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের দাবি শুনে সমস্যা সমাধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরিয়ে আনাই তাঁর উদ্দেশ্য। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অচল থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এ ক্ষেত্রে নতুন উপাচার্যের অবস্থানের একটি প্রশাসনিক ভিত্তি রয়েছে। তিনি সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য। তাঁর নিয়োগের বৈধতা নিয়ে কোনো আদালতের স্থগিতাদেশ বা নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কেবল আন্দোলনের কারণে তাঁর দায়িত্ব পালনের আইনগত অধিকার বিলুপ্ত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

তবে বৈধ নিয়োগ থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করা দুটি পৃথক বিষয়। চলমান সংকট সমাধানে দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

### সাবেক উপাচার্যের পক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কেন?

চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বড় অংশ প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অধ্যাপক সায়েম অল্প সময়ে বেশ কিছু শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ চুয়েটের বাইরে থেকে কাউকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের বিরোধিতার কথাও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আন্দোলনের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগের দাবির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এর ফলে আন্দোলনকে পুরোপুরি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। কারণ আন্দোলনের পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের প্রশ্নও রয়েছে।

একইভাবে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সংগঠিত অবস্থান নতুন উপাচার্যের জন্য প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। সোমবার শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন তাঁর সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।

### রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা আছে কি?

চুয়েটের সংকট বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে কোন কোন পক্ষ রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সুবিধা পেতে চাইছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখানে তিন ধরনের স্বার্থের সম্ভাব্য সংঘাত দৃশ্যমান।

প্রথমত, ছাত্রদলের নেতারা নতুন উপাচার্যের নিয়োগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এর ফলে তাঁরা সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একটি সংগঠন হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছেন। তবে তাঁদের এ অবস্থান ক্ষমতা বা প্রশাসনিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয়ত, আন্দোলনে ছাত্রশিবির ও সাবেক ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা থাকার অভিযোগ তুলেছে ছাত্রদলের একটি অংশ। এই অভিযোগ সত্য হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিরোধে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপস্থিতি নির্দেশ করবে। কিন্তু অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় এটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যাচ্ছে না।

তৃতীয়ত, সাবেক উপাচার্যের পক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সংগঠিত অবস্থান নির্দেশ করছে যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বাস্তব সংকট রয়েছে। আন্দোলনকারীদের প্রত্যেককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত করলে এই অসন্তোষের মূল কারণ আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অর্থাৎ চুয়েটের আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও দৃশ্যমান। কিন্তু কোন সংগঠন কতটা ইন্ধন দিয়েছে, কারা অর্থায়ন করেছে কিংবা কার নির্দেশে আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

### অবরোধ ও বাসে হামলার অভিযোগে নতুন উত্তেজনা

সোমবার সকালে নতুন উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁকে পদত্যাগের সময়সীমা বেঁধে দেন। পরে প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ রাখেন।

একই দিন চুয়েটের শিক্ষার্থীবাহী বাসে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনকারীরা স্থানীয় ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেও ঘটনাটিতে তাঁদের সম্পৃক্ততা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।

বাসে হামলার অভিযোগ এবং উপাচার্যকে অবরুদ্ধ রাখার ঘটনা পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে। কারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে থাকা প্রয়োজন।

### সংকট সমাধানে প্রয়োজন স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত

চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে কোন সুনির্দিষ্ট কারণে অপসারণ করা হলো, নতুন উপাচার্য নিয়োগে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগগুলো কতটা তথ্যভিত্তিক এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আপত্তি নিষ্পত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী উদ্যোগ নিয়েছে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

একইভাবে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমন বা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আন্দোলনে ছাত্রশিবির ও আওয়ামী লীগপন্থীদের ইন্ধনের অভিযোগ—উভয় ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক করার জন্য সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্যকর আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিক বিশ্লেষণে চুয়েটের সংকটে রাজনৈতিক মেরুকরণের উপস্থিতি স্পষ্ট হলেও পরিকল্পিত রাজনৈতিক ইন্ধনের মাত্রা এখনো প্রমাণিত নয়। ছাত্রদলের নেতাদের সমর্থন সত্ত্বেও নতুন উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত থাকায় বোঝা যাচ্ছে, ক্যাম্পাসের বিরোধ কেবল একটি ছাত্রসংগঠনের সমর্থন বা বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ নয়।

চুয়েটের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি, প্রশাসনের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অচল হয়ে পড়া শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান বিরোধ সমাধানে স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের প্রয়োগই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে পারে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চুয়েটে ছাত্রদলের সমর্থন পেয়েও অবরুদ্ধ নতুন উপাচার্য, আন্দোলনের নেপথ্যে রাজনৈতিক ইন্ধন কতটা?

১

লিটনের সেঞ্চুরির পর এবাদতের জোড়া আঘাত, জয়ের স্বপ্নে বাংলাদেশ

২

৯ হাজার রানের ক্লাবে লিটন

৩

ডিমলায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ নিয়ে অবহিতকরণ সভা

৪

নয়া দিল্লিতে বিরোধীদের পদযাত্রা ঘিরে জোরদার নিরাপত্তা, ১২ সাংবাদিক আটক

৫

ডিমলায় বালাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি গোলাম রব্বানী প্রধান

৬

দূর্গাপূজায় টানা ৮দিন বন্ধ থাকবে বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে আমদানি-রপ্তানি

৭

দূর্গাপূজায় টানা ৮দিন বন্ধ থাকবে বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে আমদানি-রপ্তানি

৮

সাভারে পেশাদার চোর চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি

৯

বীরগঞ্জ সরকারি কলেজের মেইন গেটের উদ্বোধন করলেন সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু_এমপি

১০

দিনাজপুর ফুলবাড়ী পৌরসভায় মোটরসাইকেল চুরি, থানায় অভিযোগ

১১

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন বিশেষ অভিযান

১২

অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন দুই মার্কিন গবেষক, যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ তিন বছরের সর্বোচ্চে

১৩

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মন্দিরে চুরি, স্বর্ণালংকারসহ ছয়টি মূর্তি লুট

১৪

জ্বালানি যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, ৬০ দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান রাশিয়ার

১৫

চুয়েটে সকালে তালা ভেঙে দপ্তরে প্রবেশ, দুপুরে উপাচার্যকে ভেতরে রেখেই ফের তালা

১৬

বীরগঞ্জে প্রভাব বিস্তার করে অসহায় ভ্যান চালকের বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে উচ্ছেদ করে সেখানে পুকুর খনন.

১৭

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হত্যা: সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে কক্সবাজারে হোটেল কর্মচারী গ্রেপ্তার

১৮

টানা ২০ দিনের অচলাবস্থা, শাটডাউনের মাঝেই তালা ভেঙে দপ্তরে চুয়েটের নতুন উপাচার্য, সঙ্গে ছাত্রদল নেতারা!

১৯

৩৫ হাজার মুক্তায় দেবী দুর্গার অপরূপ সাজ, সাতক্ষীরার বুড়িয়ায় দর্শনার্থীদের ঢল

২০