নিউজ ডেস্ক
১২ ঘন্টা আগে
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১৬ জন

শার্শায় শামুক বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিন শতাধিক দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা

মনির হোসেন, বেনাপোল প্রতিনিধি :
যশোরের শার্শা উপজেলায় প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিন শতাধিক দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা। গ্রামাঞ্চলে কাজের অভাব এবং বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও শামুক সংগ্রহে নামছে। প্রতিদিন কেজিপ্রতি মাত্র ৭ টাকা দরে শামুক বিক্রি করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তারা। তবে নির্বিচারে শামুক আহরণে পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ডিহি, লক্ষণপুর, বাহাদুরপুর, শার্শা সদর ও নিজামপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের জলাশয়গুলোতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শামুক সংগ্রহ করছেন নিম আয়ের পরিবারের সদস্যরা। কেউ হেঁটে, আবার কেউ ডিঙি নৌকায় চড়ে খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয় থেকে শামুক কুড়িয়ে আনছেন। পরে বিকেলে ইউনিয়নভিত্তিক নির্ধারিত স্থানে শামুক জড়ো করে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন তারা।

সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একজন দিনে ৩০ থেকে ৭০ কেজি পর্যন্ত শামুক সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতি কেজি ৭ টাকা দরে বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু মাঠে কৃষিকাজসহ অন্য কাজের সুযোগ কম থাকায় জীবিকার তাগিদে এ পেশায় যুক্ত থাকতে হচ্ছে তাদের।

জীবিকা নির্বাহের দায়ে শামুক শিকারে নামা জয়দেব চক্রবর্তী জানান, বর্ষার মৌসুমে কৃষিকাজ বা অন্য কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় পেটের দায়ে তারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তা নিয়ে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। শামুক সংগ্রহ করে প্রতিদিন তাদের জনপ্রতি চারশ থেকে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত আয় হয়।

ডিহি ইউনিয়নের তেবাড়িয়া জেলেপল্লীর শামুক সংগ্রহকারী দীলিপ মন্ডল, বিজয়, রিনা রাণী, আরতি দাসী, রাধে বালা ও রফিকুল ইসলাম এবং নিজামপুর ইউনিয়নের পোতাপাড়ার পবন মন্ডল, অসিম তরফদার, আলো বিশ্বাস, মিলন রাণী ও নলিতা রাণীসহ অনেকে জানান, ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন জলাশয়ে ঘুরে শামুক সংগ্রহ করেন তারা।

তাদের ভাষ্য, মাঠে তেমন কাজ না থাকায় বাধ্য হয়েই শামুক সংগ্রহ করতে হচ্ছে। দিন শেষে শামুক বিক্রির টাকা দিয়েই কোনো রকমে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তারা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এত অল্প আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শামুক ব্যবসায়ী শার্শা উপজেলার স্বরূপদাহ এলাকার কামাল হোসেন, আকরম আলী ও নিত্য মন্ডল জানান, দক্ষিণ ও উত্তর শার্শায় পৃথক দুটি ব্যবসায়ী গ্রুপ এ বছর কয়েকটি ইউনিয়নের সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ মণ শামুক কিনছে। প্রতি কেজি শামুকের ক্রয়মূল্য ৭ টাকা।

অন্যদিকে শামুক ব্যবসায়ী আব্দুল মমিন জানান, এই ব্যবসার সঙ্গে এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছেন। বর্ষার এই তিন-চার মাস জুড়ে তাদের পাইকারি কেনাবেচা চলে। তারা স্থানীয় সংগ্রাহকদের কাছ থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিভিন্ন জেলার বড় বড় আড়তে সরবরাহ করে থাকেন।

তারা জানান, সংগৃহীত শামুক খুলনার চেঁচুড়ি-কাপালিয়ায় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। সেখানে মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করার পর শামুক চিংড়ি ও পাঙ্গাশ মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, এ বছর খাল-বিল ও জলাশয়ে পানির পরিমাণ কম থাকায় এবং পানিতে অ্যালার্জিজনিত সমস্যার কারণে আগের বছরের তুলনায় শামুক সংগ্রহকারী পরিবারের সংখ্যা কমেছে।

শার্শা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ বালা বলেন, সরকারিভাবে শামুক-ঝিনুক সংরক্ষণের প্রকল্প রয়েছে, তবে সেটি এ অঞ্চলে প্রযোজ্য নয়। শামুক জলাশয়ের প্রাকৃতিক পরিশোধন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পানির বিভিন্ন দূষিত পদার্থ পরিশোধনে সহায়তার মাধ্যমে জলজ প্রাণীর বসবাসের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে শামুক।

তিনি আরো বলেন, অতিরিক্ত শামুক আহরণ বা নিধন করা হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যারা শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন, তাদের নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে ওয়াহিদ বলেন, শার্শা অঞ্চলে অবৈধভাবে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহের বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা হবে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনে শামুক সংগ্রহকারী ও এর সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একদিকে কর্মসংস্থানের অভাবে দরিদ্র পরিবারের জীবিকার লড়াই, অন্যদিকে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ শার্শায় শামুক আহরণ ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন দ্বিমুখী বাস্তবতা। সংশ্লিষ্টদের মতে, দরিদ্র পরিবারগুলোর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক জলজ সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাবা হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন বলিউড তারকা সালমান খান

১

জল্পনা কল্পনার অবসান বীরগঞ্জে নতুন সার ডিলারি পেলেন যারা যারা.

২

রিশাদকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হোবার্ট

৩

মদিনায় বৃহস্পতিবার হামলা চালানোর কথা অস্বীকার হুতির

৪

পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

৫

শার্শার বাগআঁচড়া বাজারে ভোক্তা অধিকারের অভিযান, দুই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

৬

সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রেস কাউন্সিলের প্রস্তাবকে বিএমএসএফের সমর্থন

৭

ডিমলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহ শুরু, তথ্য নেওয়া হবে ৭৭ হাজার পরিবারের

৮

শার্শায় শামুক বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিন শতাধিক দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা

৯

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বিশালের জানাজা সম্পন্ন

১০

দিনাজপুর বীরগঞ্জে সাহাডুবীতে দুর্গোৎসব ঘিরে উৎসবের আমেজ

১১

আশুলিয়ায় পোশাককর্মীর মৃত্যু, এমডি-পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা

১২

তিতাস নদী থেকে বিদেশি পিস্তল ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার

১৩

কোটচাঁদপুরে পুলিশের বিশেষ অভিযান: ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেফতার

১৪

ফ্রান্স ঋণের দুষ্টচক্রে পড়েনি: অর্থমন্ত্রী রোলান্ড লেস্কুর

১৫

আশুলিয়ায় শারমিন গ্রুপের কর্মকর্তার মৃত্যু, পরিবারের দাবি হত্যা

১৬

জবিতে পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের গরু ভোজের ঘোষণা

১৭

লাকসাম উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের নতুন কমিটি অনুমোদন, নেতৃত্বে মহসিন–শাখাওয়াত ও মহিন–নেওয়াজ

১৮

গ্রিনল্যান্ডে বিপুল তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৯

যুদ্ধ-নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও থামছে না ইরানের শিল্পচর্চা, নতুন আশার আলো ‘কন্টিনিউয়াম’

২০