আন্তর্জাতিক ডেস্ক | লিড নিউজ ২৪:
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে ব্যাপক পরিসরে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিরাপত্তা চুক্তির পর তাঁর এ ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, গ্রিনল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের প্রস্তুতি চলছে। অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলের তুলনায় সেখানে সহজে উত্তোলনযোগ্য তেলের মজুত অনেক বেশি হতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি এর ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে গ্রিনল্যান্ডে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ কীভাবে হবে, কোন প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করবে কিংবা কবে থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
আর্কটিক মহাসাগর ও উত্তর আটলান্টিকের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ। ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের অধীনে থাকা অঞ্চলটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। দীর্ঘদিন ধরেই দ্বীপটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকাগামী সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথের কাছাকাছি হওয়ায় দ্বীপটি সামরিক নজরদারি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।
ট্রাম্প তাঁর পরিকল্পিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গ্রিনল্যান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো আকাশপথের হামলার ক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেখানে মোতায়েন করা মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করার সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করেন তিনি।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দশ পৃষ্ঠার ওই চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের পথ তৈরি হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের নারসারসুয়াক এবং পূর্বাঞ্চলের মেস্টারসভিগ এলাকায় দুটি নতুন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে দ্বীপটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক স্পেস বেস পরিচালিত হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের তেল, গ্যাস বা খনিজ সম্পদ উত্তোলনের বিশেষ কোনো অধিকার দেওয়া হয়নি। চুক্তিতে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
ফলে ট্রাম্পের ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে গ্রিনল্যান্ড সরকার ২০২১ সালেই নতুন তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। একই বছর ইউরেনিয়াম খননের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পুরোনো অনুমতির ভিত্তিতে ২০২৭ সালে গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে তেল অনুসন্ধানের পরিকল্পনা জানিয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট অনুমতির বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডে বিরল খনিজ সম্পদের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সামরিক সরঞ্জাম, স্মার্টফোন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরিতে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহে চীনের প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। সেই বিবেচনায় গ্রিনল্যান্ড ওয়াশিংটনের কাছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে দ্বীপটির প্রতিকূল আবহাওয়া, বিস্তীর্ণ বরফাচ্ছাদিত এলাকা, দুর্বল অবকাঠামো এবং খনিজ উত্তোলনের উচ্চ ব্যয় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে বিপুল সম্পদের সম্ভাবনা থাকলেও সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা কতটা সম্ভব, তা এখনো অনিশ্চিত।
গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এমনকি অতীতে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
নতুন করে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানের ঘোষণা সেই বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ওপর যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়ছে।
তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণার পর গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় গ্রিনল্যান্ডে ব্যাপক তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের ঘোষণা বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেবে, নাকি নতুন ভূরাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেবে—সেদিকেই নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।
মন্তব্য করুন