লাইফস্টাইল | লিড নিউজ ২৪:
যুদ্ধের ভয়াবহতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত ইরানের শিল্পজগৎ। বন্ধ হয়ে গেছে বহু চিত্রকলা প্রদর্শনী, সংকুচিত হয়েছে শিল্পকর্মের বাজার। রং-তুলি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে অনেক শিল্পীই নিজেদের সৃজনশীল কাজ চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন। তবে এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও শিল্পচর্চা বাঁচিয়ে রাখতে নতুন এক উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে দেশটির শিল্পীদের।
ইরানের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে চালু হয়েছে ‘কন্টিনিউয়াম: আর্টিস্ট রিলিফ ফর ইরান’ নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পপ্রেমী ও সংগ্রাহকেরা সরাসরি ইরানি শিল্পীদের শিল্পকর্ম কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিক্রি হওয়া শিল্পকর্মের সম্পূর্ণ অর্থ পৌঁছে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট শিল্পীর কাছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর ইরানের শিল্পজগতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের আর্ট গ্যালারি বন্ধ হয়ে যায়। বাতিল হয় একের পর এক প্রদর্শনী। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় শিল্পীদের আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে যেসব শিল্পী দীর্ঘদিন কাজ করে একটি প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিল্পকর্ম বিক্রির ওপর নির্ভর করতেন, তাঁরা সবচেয়ে বেশি আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকেই শিল্পচর্চা ছেড়ে বিকল্প পেশায় যাওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই সংকটের মধ্যেই শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন কানাডীয়-ইরানি শিল্পকলা সংগঠক দারিও দুরান। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন ইরানি কিউরেটর মারিয়াম রাস্তি। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে কন্টিনিউয়াম।
ইরানের শিরাজ শহরে জন্ম নেওয়া দুরান বেড়ে উঠেছেন কানাডায়। কয়েক বছর আগে নিজের শিকড়ের সন্ধানে ইরানে ফিরে এসে দেশটির সমকালীন শিল্পচর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হন তিনি।
যুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শিরাজ ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হন দুরান। সেই অভিজ্ঞতা এবং বাস্তুচ্যুত অন্য শিল্পীদের দুর্দশা তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
আন্তর্জাতিক শিল্পসংগ্রাহক, গ্যালারি মালিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তিনি। তাঁর আহ্বানে সাড়া দেন লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস, দুবাই, টরন্টো ও মুম্বাইয়ের শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রাথমিকভাবে সীমিতসংখ্যক শিল্পীর কাজ তুলে ধরার পরিকল্পনা থাকলেও উদ্যোগটি দ্রুত বড় পরিসরে বিস্তৃত হয়। বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মে ইরানের দুই শতাধিক শিল্পীর পাঁচ শতাধিক শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ইরানের ১১টি গ্যালারি নিজেদের বিক্রয় কমিশন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আয়োজক প্রতিষ্ঠানও কোনো প্ল্যাটফর্ম ফি নিচ্ছে না। ফলে শিল্পকর্ম বিক্রির পুরো অর্থ শিল্পীরা পাচ্ছেন।
শিল্পকর্মের মূল্য সাধারণ ক্রেতাদের নাগালে রাখতে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ৫০০ ডলার, ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ ডলার এবং ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ডলারের মধ্যে শিল্পকর্ম কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্পকর্ম পৌঁছে দেওয়াও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বিমান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ইরান থেকে সরাসরি শিল্পকর্ম পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে স্থলপথে আর্মেনিয়ায় শিল্পকর্ম নিয়ে সেখান থেকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রেতাদের কাছে শিল্পকর্ম পৌঁছাতে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিল্পীদের দৈনন্দিন জীবনেও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। তেহরানের শিল্পী এলহাম ইসারির অভিজ্ঞতা তারই একটি উদাহরণ। সাধারণ সাদা রঙের একটি টিউব কিনতেও তাঁকে প্রায় ৫০ লাখ ইরানি তোমান খরচ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় রং ও উপকরণের এমন সংকট শিল্পীদের কাজকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কারণে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক শিল্পী। বিস্ফোরণের শব্দ, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মধ্যে নিয়মিত শিল্পচর্চা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে সংকটের মধ্যেও হাল ছাড়তে রাজি নন ইরানি শিল্পী মেহরদাদ জাফারি। তাঁর কাছে শিল্পচর্চা শুধু জীবিকা নয়, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রয়োজনীয় উপকরণ না পেলে বিকল্প উপায়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন এই শিল্পী।
উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য কেবল আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়; বরং ইরানের শিল্পীদের সৃজনশীল পরিচয় আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করা। তাঁরা চান না, বিশ্ববাসী ইরানের শিল্পকে শুধু যুদ্ধ, সংঘাত কিংবা রাজনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখুক।
ইরানের সমকালীন শিল্পে চিত্রকলা, আলোকচিত্র, ভাস্কর্য, বিমূর্ত শিল্পসহ নানা ধরনের সৃজনশীল কাজ রয়েছে। আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে সেই বৈচিত্র্য তুলে ধরাই কন্টিনিউয়ামের অন্যতম উদ্দেশ্য।
শিল্পীদের মতে, বিদেশে শিল্পকর্ম বিক্রির সুযোগ অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি মানসিক শক্তিও জোগাচ্ছে। সংকটের মধ্যেও তাঁদের কাজ যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিই নতুন করে সৃষ্টিশীল কাজে মনোযোগী হওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের শিল্পীদের সামনে অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ থাকলেও কন্টিনিউয়ামের মতো উদ্যোগ প্রমাণ করছে, সৃজনশীলতার চর্চা সহজে থেমে থাকে না। প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পীরা তাঁদের কাজের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখতে চান। আর এই প্রচেষ্টাই ইরানের শিল্পজগতের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
মন্তব্য করুন