টেনেসি প্রদেশে ২০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে নজিরবিহীন এই বিভ্রাট ঘটেছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওই নারী।
লিড নিউজ ২৪ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি প্রদেশে ২০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে চরম ব্যর্থতার মুখে পড়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ক্রিস্টা পাইক নামের এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে পরপর দু’টি প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়া হলেও তার মৃত্যু হয়নি। উল্টো ইনজেকশন দেওয়ার ৪০ মিনিট পরও তাকে নাক ডাকতে ও ভারী শ্বাস নিতে দেখা যায়। নজিরবিহীন এই ঘটনার পর তড়িঘড়ি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্থগিত করে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার সকালে ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী তাকে প্রাণঘাতী ‘পেন্টোবারবিটাল’ ইনজেকশনের দুটি ডোজ দেওয়া হয়। কিন্তু বিষাক্ত এই ওষুধ প্রয়োগের ৪০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যু হয়নি। উপস্থিত সংবাদমাধ্যমকর্মী ও আইনজীবীরা জানান, ইনজেকশন দেওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরও ক্রিস্টাকে নাক ডাকতে এবং কষ্ট করে শ্বাস নিতে শোনা যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কর্তৃপক্ষ দ্রুত জানালার পর্দা নামিয়ে দেয় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্থগিত ঘোষণা করে। পরে এক বিবৃতিতে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ক্রিস্টা পাইককে কারাগারের বাইরের একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা ঠিক কীরকম, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এই মৃত্যুদণ্ডের পেছনের ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে, ১৯৯৫ সালে। তখন ক্রিস্টা পাইকের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। নক্সভিলের একটি জব কর্পস সেন্টারে সহপাঠী ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন ক্রিস্টা। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ক্রিস্টা এবং তার প্রেমিক তাদারিল শিপ মিলে স্লেমারকে একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে তার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। স্লেমারের শরীরে শয়তানের উপাসনার প্রতীক ‘পেন্টাগ্রাম’ এঁকে দেওয়া হয়েছিল এবং হত্যার পর তার মাথার খুলির একটি অংশ ‘ট্রফি’ হিসেবে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন ক্রিস্টা। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায়ে ক্রিস্টাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে, তার প্রেমিক শিপের বয়স ১৭ হওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
টেনেসি প্রদেশে গত ২০০ বছরে কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। এছাড়া আধুনিক যুগে ১৮ বছর বয়সে করা অপরাধের জন্য ওই রাজ্যে একমাত্র ক্রিস্টাকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ক্রিস্টার আইনজীবীরা তার প্রাণভিক্ষার আবেদন জানিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, অপরাধ সংঘটনের সময় ক্রিস্টা নিতান্তই কিশোরী ছিলেন এবং তিনি বাইপোলার ডিজঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগছিলেন। শৈশবে চরম অবহেলা এবং নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণেই তার মানসিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছিল বলে দাবি করেন আইনজীবীরা। এছাড়া প্রায় ৩০ বছর ধরে তাকে একটি পার্কিং স্পেসের সমান সেলে নিঃসঙ্গ অবস্থায় বা সলিটারি কনফাইনমেন্টে বন্দি রাখা হয়েছিল। তবে টেনেসির গভর্নর তার প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দেন। এরপরই বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা শেষ পর্যন্ত এক অভাবনীয় বিভ্রাটে পরিণত হলো। ক্রিস্টা পাইকের বেঁচে যাওয়ার এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা এবং মৃত্যুদণ্ডে ব্যবহৃত প্রাণঘাতী ইনজেকশনের কার্যকারিতা ও মানবাধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মন্তব্য করুন