লিড নিউজ ২৪ ডেস্ক:
ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রীতিমতো তাণ্ডব চালাচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা। আগুন জ্বলছে স্কুলগুলোর সামনে, পুলিশের সাথে চলছে সংঘর্ষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের শুরু হলেও, এর পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন দেখছে ফরাসি প্রশাসন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলে ইঁদুর ও তেলাপোকার উপদ্রব, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকের অভাব, অনেক বেশি হোমওয়ার্ক, দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস করা এবং স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো তাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এসবের প্রতিবাদেই তারা রাস্তায় নেমেছে।গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের শহরতলী ক্রেটেইলের (Créteil) একটি লাইসিতে (উচ্চ বিদ্যালয়) প্রথম এই বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর তা দ্রুত প্যারিসের অন্যান্য দরিদ্র শহরতলী, এমনকি লিল, বোর্দো এবং লিওঁ-এর মতো শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা নুনেস (Laurent Nuñez) জানিয়েছেন, এই আন্দোলন মোটেও প্রশমিত হচ্ছে না, বরং আরও “বিস্তৃত” হচ্ছে এবং “সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে”।
বিক্ষোভকারীরা স্কুলের বাইরে জ্বলন্ত ব্যারিকেড তৈরি করে এবং পুলিশের ওপর আতশবাজি ছুড়ে মারে। বোর্দোতে একটি লাইসির বাইরে আগুন নেভাতে গিয়ে এক দমকলকর্মী অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ভিডিও সামনে এসেছে। এখন পর্যন্ত ৩৫৬টি স্কুলে বিক্ষোভ হয়েছে, ৬২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৮৩ জন নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন।
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়াখ জ়েফ্রে (Édouard Geffray) জানিয়েছেন, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ১১৯ জন শিক্ষার্থী ও কর্মী আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, পুলিশের বিরুদ্ধেও বাড়াবাড়ির অভিযোগ উঠেছে। প্যারিসের কাছে একটি স্কুলে বিক্ষোভের সময় পুলিশের ছোঁড়া টিয়ার গ্যাসের শেলের আঘাতে এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরের কয়েকটি দাঁত ভেঙে যায়। এই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
ফ্রান্সে প্রতি বছর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময় স্কুলগুলোতে কিছু বিক্ষোভ হয়ে থাকে, তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। আতশবাজি, মুখোশধারী বহিরাগতদের অংশগ্রহণ এবং টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত সংগঠিত হওয়া— এসব বিষয় সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ (Emmanuel Macron) পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমি তরুণদের উদ্বেগ এবং ক্ষোভ বুঝতে পারছি। তবে কোনো ভয়ই সহিংসতাকে বৈধতা দেয় না।” তিনি কিছু রাজনৈতিক নেতাকে শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ফ্রান্সের কট্টর-বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এই উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীরা এবং ইউনিয়নগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে ফরাসি স্কুলগুলোর প্রকৃত অব্যবস্থাপনা থেকেই তাদের ক্ষোভের জন্ম।
বামপন্থী নেতা জঁ-ল্যুক মেলাঁশঁ (Jean-Luc Mélenchon)-এর দল ‘ফ্রান্স আনবাউড’ (France Unbowed)-এর দিকেই সরকার অভিযোগের আঙুল তুলেছে। তবে মেলাঁশঁ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তার দল “অহিংস আন্দোলনের” পক্ষে।
ফ্রান্সের সরকারি ঋণ এখন ৩.৬ ট্রিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যা জিডিপির ১১৯ শতাংশ। সরকার যখন ব্যয় সংকোচনের চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই স্কুল বিক্ষোভ তাদের জন্য এক নতুন সংকট তৈরি করেছে।
সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট ফ্রঁসোয়া ওলঁদ (François Hollande) সতর্ক করে বলেছেন, “তরুণরা যখন রাস্তায় নামে, তখন তা টিউব থেকে বেরিয়ে আসা টুথপেস্টের মতো। একে আবার ভেতরে ঢোকানো খুব কঠিন।”
মন্তব্য করুন