সায়মন খান|
৩ ঘন্টা আগে
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ২৭ জন

বিশ্ব ক্রিকেটে ৪০০ রান তাড়া, বাংলাদেশে ৩০০ নিয়েই সংশয়: ওয়ানডেতে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে টাইগাররা?

সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪|

একসময় যে সংস্করণে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামত, সেই ওয়ানডে ক্রিকেটই এখন সমর্থকদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ক্রিকেট যখন ৪০০ রানের বিশাল লক্ষ্যও তাড়া করে জয়ের ইতিহাস গড়ছে, তখন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ৩০০ রান করার সামর্থ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। অনেক সমর্থক এখন ম্যাচ শুরুর আগেই সংশয়ে থাকেন, বাংলাদেশ আদৌ ৫০ ওভারে ৩০০ রান করতে পারবে কি না।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মূলত সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ব্যাটিং ব্যর্থতায়। জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে একের পর এক পরাজয়, সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে না পারা, ব্যাটিং অর্ডারে ঘন ঘন পরিবর্তন এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের শূন্যতা পূরণে ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

বিশেষ করে একসময় যাঁরা ওপেনিংয়ে ব্যাট করতেন, তাঁদের অনেককেই এখন তিন, চার, পাঁচ কিংবা ছয় নম্বরে খেলানো হচ্ছে। অথচ নতুন ভূমিকায় অধিকাংশ ব্যাটার ধারাবাহিক সাফল্য পাচ্ছেন না। অন্যদিকে তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো পরীক্ষিত ক্রিকেটারদের তৈরি করা নির্ভরতার জায়গাটিও এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে, যে ওয়ানডে ক্রিকেট বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানেই কি ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে টাইগাররা?

সর্বশেষ পাঁচ ওয়ানডে: চার পরাজয়ে ব্যাটিংয়ের করুণ চিত্র

বাংলাদেশের সর্বশেষ পাঁচটি ওয়ানডের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পাঁচ ম্যাচে মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি চারটিতে হারতে হয়েছে, যার তিনটি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এবং একটি আফগানিস্তানের কাছে।

২১ অক্টোবর ২০২৬, শারজায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র ১৬০ রানে অলআউট হয়ে ৭ উইকেটে পরাজিত হয়। এর আগে ১৭ অক্টোবর আবুধাবিতে জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১৭২ রানে গুটিয়ে যায় টাইগাররা। পরাজয়ের ব্যবধান ছিল ৯৯ রান।

এর আগে জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরের প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিল মাত্র ১৪২ রান। অথচ পুরো দল অলআউট হয় ১১৬ রানে। দ্বিতীয় ম্যাচে ২৪৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ২৩৪ রানে থেমে যায় বাংলাদেশ। সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে অবশ্য ২০০ রানের লক্ষ্য ৭ উইকেট হাতে রেখে পেরিয়ে যায় দল।

অর্থাৎ সর্বশেষ পাঁচ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সংগ্রহ যথাক্রমে ১৬০, ১৭২, ২০০, ২৩৪ ও ১১৬ রান। পাঁচ ম্যাচে মোট রান ৮৮২, ইনিংসপ্রতি গড় মাত্র ১৭৬ দশমিক ৪। একবারও ২৫০ রানের ঘরে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ।

আরও উদ্বেগের বিষয়, পরাজিত চার ম্যাচের কোনোটিতেই পুরো ৫০ ওভার ব্যাট করতে পারেনি দল। চার ম্যাচে মোট ২০০ ওভার খেলার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের ইনিংস টিকেছে মাত্র ১৫৬ ওভার ২ বল। অর্থাৎ ৪৩ ওভার ৪ বল অব্যবহৃত রেখেই শেষ হয়েছে ইনিংসগুলো।

এই পরিসংখ্যান শুধু পরাজয়ের গল্প বলছে না, ব্যাটারদের ক্রিজে টিকে থাকার সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে।

১৪২ রানও তাড়া করতে ব্যর্থ, তাহলে ৩০০ রানের আত্মবিশ্বাস আসবে কোথা থেকে?

বাংলাদেশের ব্যাটিং সংকটের সবচেয়ে হতাশাজনক উদাহরণ গত ৬ জুলাই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে। সেদিন তরুণ পেসার নাহিদ রানা অসাধারণ বোলিং করে মাত্র ২১ রান দিয়ে ৬ উইকেট তুলে নেন। তাঁর বোলিং নৈপুণ্যে জিম্বাবুয়ে অলআউট হয় মাত্র ১৪১ রানে।

জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১৪২ রান। কিন্তু সেই সামান্য লক্ষ্যও তাড়া করতে পারেননি ব্যাটাররা। মাত্র ১১৬ রানে শেষ হয় ইনিংস। যে ম্যাচে বোলাররা জয়ের ভিত তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেই ম্যাচই ব্যাটারদের ব্যর্থতায় পরিণত হয় পরাজয়ের গল্পে।

পরের ওয়ানডেতেও বদলায়নি দৃশ্যপট। তাওহিদ হৃদয়ের ৬০ এবং তানজিদ হাসান তামিমের ৫৭ রানের পরও ২৪৮ রানের লক্ষ্য পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ।

১৭ অক্টোবর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৭২ রান তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানে অলআউট হওয়া কিংবা ২১ অক্টোবর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৬০ রানে থেমে যাওয়া—প্রতিটি ম্যাচই ব্যাটিংয়ের একই দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাত্র ২৮ রানে ৪ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। এরপর পারভেজ হোসেন ইমনের ৭০ এবং সাইফ হাসানের ৪১ রানের ইনিংসে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত বড় সংগ্রহ আসেনি।

এমন ব্যর্থতার পর সমর্থকদের মনে ৩০০ রান নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে দলের কাছে ২৫০ থেকে ২৭০ রানের লক্ষ্য নিয়মিতভাবে অতিক্রম করা এত কঠিন হয়ে উঠলে বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবেই।

ওপেনারদের মিডল অর্ডারে খেলিয়ে কতটা লাভ হচ্ছে বাংলাদেশের?

বাংলাদেশের ওয়ানডে ব্যাটিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো ব্যাটিং পজিশনে স্থিতিশীলতার অভাব। একজন ক্রিকেটার যেই পজিশনে দীর্ঘদিন খেলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাঁকে অন্য পজিশনে নামিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

লিটন দাস, সৌম্য সরকার, পারভেজ হোসেন ইমন, নাজমুল হোসেন শান্ত এবং সাইফ হাসানের মতো ক্রিকেটাররা বিভিন্ন সময় ইনিংস উদ্বোধন করেছেন কিংবা টপ অর্ডারে খেলেছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে এখন মিডল অর্ডারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ লিটন দাস। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের বড় অংশে ওপেনার হিসেবে খেলা লিটন তাঁর প্রথম পাঁচটি ওয়ানডে শতকের সব কটিই করেছেন ইনিংস উদ্বোধন করে। কিন্তু মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহর বিদায়ের পর মিডল অর্ডারের দুর্বলতা কাটাতে তাঁকে পাঁচ নম্বরে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেয় টিম ম্যানেজমেন্ট।

২০২৬ সালের মার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের আগে বাংলাদেশের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স লিটনকে পাঁচ নম্বরে খেলানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। মূলত স্পিনের বিপক্ষে তাঁর দক্ষতা এবং মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞতার ঘাটতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিন্তু একজন প্রতিষ্ঠিত ওপেনারকে মিডল অর্ডারে নামালেই কি মুশফিক কিংবা মাহমুদউল্লাহর বিকল্প তৈরি হয়ে যায়? লিটন নিজেও স্বীকার করেছিলেন, ওপেনিং থেকে মিডল অর্ডারে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়।

সৌম্য সরকারের ক্ষেত্রেও ব্যাটিং পজিশনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ১৭ অক্টোবর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তানজিদের সঙ্গে ওপেনিং করেছিলেন সৌম্য। কিন্তু চার দিন পর আফগানিস্তানের বিপক্ষে তাঁকে নামানো হয় তিন নম্বরে। আর ওপেনিংয়ে পাঠানো হয় সাইফ হাসানকে, যিনি আগের ম্যাচে চার নম্বরে ব্যাট করেছিলেন।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন নম্বরে নেমে প্রথম বলেই আউট হন সৌম্য। সাইফ ৪১ রান করলেও ৮২ বল খেলে সেই ইনিংস গড়েন। অর্থাৎ ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন এনে কাঙ্ক্ষিত আক্রমণাত্মক শুরু কিংবা বড় সংগ্রহ—কোনোটিই পায়নি বাংলাদেশ।

পারভেজ হোসেন ইমনও মূলত ওপেনিংয়ে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যাটার। অথচ আফগানিস্তানের বিপক্ষে তাঁকে ছয় নম্বরে খেলানো হয়। সেদিন ৭০ রান করে দলের সর্বোচ্চ সংগ্রাহক হলেও তাঁর এই ইনিংস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বাংলাদেশ কি বিশেষায়িত মিডল অর্ডার ব্যাটার তৈরি করতে না পেরে ওপেনারদের দিয়েই সেই দায়িত্ব পূরণের চেষ্টা করছে?

নাজমুল হোসেন শান্তও ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে ওপেনিং এবং তিন নম্বরে খেলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে চার নম্বরেও দেখা গেছে। যদিও তিন নম্বর টপ অর্ডারের অংশ, তবু পজিশনের পরিবর্তনের সঙ্গে একজন ব্যাটারের দায়িত্ব ও প্রস্তুতির ধরন বদলে যায়।

তানজিদ হাসান তামিমকে অবশ্য সাম্প্রতিক ওয়ানডেগুলোতে নিয়মিত ওপেনার হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে। জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ ওয়ানডেতে তানজিদ ও সৌম্য সরকারের ১৫১ রানের উদ্বোধনী জুটি দেখিয়েছে, পরিচিত পজিশনে খেলেও বড় সাফল্য পাওয়া সম্ভব।

ওপেনারদের মিডল অর্ডারে খেলানো সব সময় ভুল সিদ্ধান্ত নয়। বিশ্ব ক্রিকেটে অনেক সফল ব্যাটারই বিভিন্ন পজিশনে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ঘন ঘন পরিবর্তন, অনিশ্চিত দায়িত্ব এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব ব্যাটারদের ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

ওয়ানডেতে একজন ওপেনারকে নতুন বল মোকাবিলা করে পাওয়ারপ্লেতে রান তোলার প্রস্তুতি নিতে হয়। অন্যদিকে মিডল অর্ডারে নামা ব্যাটারকে পরিস্থিতি অনুযায়ী স্পিন সামলানো, ইনিংস পুনর্গঠন এবং শেষদিকে দ্রুত রান তোলার দায়িত্ব পালন করতে হয়।

বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে তাই বড় প্রশ্ন—প্রকৃত মিডল অর্ডার ব্যাটার তৈরির পরিবর্তে ওপেনারদের জায়গা বদল করেই কি সংকট কাটানোর চেষ্টা চলছে?

তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর শূন্যতা কি পূরণ হয়েছে?

বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের সফল সময়ের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিলেন তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এই চার ক্রিকেটার বহু বছর ধরে দেশের ব্যাটিংয়ের মূল দায়িত্ব পালন করেছেন।

তামিম ইকবাল ছিলেন ইনিংস উদ্বোধনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। ২৪৩ ওয়ানডেতে ৮ হাজার ৩৫৭ রান করা তামিম শুধু বড় ইনিংস খেলতেন না, নতুন বল সামলে অন্য ব্যাটারদের জন্য ভিতও গড়ে দিতেন। তাঁর জায়গায় একাধিক ক্রিকেটার সুযোগ পেলেও এখনো তামিমের মতো ধারাবাহিক একজন ওপেনার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সাকিব আল হাসান ছিলেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডারদের একজন। ২৪৭ ওয়ানডেতে ৭ হাজার ৫৭০ রান এবং ৩১৭ উইকেট তাঁর অসাধারণ অবদানের সাক্ষ্য দেয়। ব্যাটিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইনিংস সামলানো, বোলিংয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা এবং দলের ভারসাম্য বজায় রাখা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন জাতীয় দলে তাঁর অনুপস্থিতিতে সমমানের একজন পূর্ণাঙ্গ বিকল্প পাওয়া যায়নি।

মুশফিকুর রহিম ছিলেন বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটারদের একজন। ২৭৪ ওয়ানডেতে ৭ হাজার ৭৯৫ রান করেছেন তিনি। টপ অর্ডার ব্যর্থ হলে ইনিংস পুনর্গঠন এবং চাপের মুহূর্তে দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকার সামর্থ্য তাঁকে আলাদা জায়গা দিয়েছিল।

অন্যদিকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ছিলেন শেষদিকে ব্যাটিংয়ের অন্যতম প্রধান ভরসা। ২৩৯ ওয়ানডেতে ৫ হাজার ৬৮৯ রান করা এই ক্রিকেটার বহুবার কঠিন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেছেন। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসগুলো এখনো ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

এই চার ক্রিকেটারের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ শুধু অভিজ্ঞতা হারায়নি; হারিয়েছে ব্যাটিংয়ের চারটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নির্ভরযোগ্যতা।

তামিমের অনুপস্থিতিতে ওপেনিংয়ে স্থিতিশীলতার সংকট, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর বিদায়ে মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞতার অভাব এবং সাকিবের অনুপস্থিতিতে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের ঘাটতি—সবকিছু মিলিয়ে ওয়ানডে দলের পুরোনো ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।

বর্তমান দলে লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহিদ হৃদয়, তানজিদ হাসান তামিম, মেহেদী হাসান মিরাজসহ বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ক্রিকেটার রয়েছেন। তাঁদের ব্যক্তিগত ভালো পারফরম্যান্সও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দলকে নির্ভরতা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি দৃশ্যমান।

২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩৩ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ব্যাটারদের শতক এসেছে মাত্র চারটি। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০২৪ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৫০-এর বেশি রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের পর থেকে আর কোনো ওয়ানডেতে এমন লক্ষ্য সফলভাবে অতিক্রম করতে পারেনি বাংলাদেশ।

এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের অবসরের পর নতুন প্রজন্ম এখনো ধারাবাহিকভাবে বড় ইনিংস খেলা কিংবা বড় লক্ষ্য তাড়া করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি।

বিশ্ব ক্রিকেটে ৪০০ রান তাড়া, বাংলাদেশে ২৫০-ই কঠিন!

আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের মানদণ্ড দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। পাওয়ারপ্লেতে আক্রমণাত্মক শুরু, মাঝের ওভারে ধারাবাহিকভাবে রান তোলা এবং শেষ ১০ ওভারে দ্রুত রান বাড়িয়ে নেওয়া এখন সফল দলগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভারতের গুয়াহাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডেতে তার বড় উদাহরণ দেখা গেছে। সেদিন ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমে ব্যাট করে ৫০ ওভারে ৪০৫ রান তোলে। বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত মাত্র ৪৩ দশমিক ৩ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ৪০৬ রান তুলে জয় নিশ্চিত করে।

ভারতের অধিনায়ক শুভমান গিল অপরাজিত ২২৩ এবং রোহিত শর্মা ১০১ রান করেন। ৪০০-এর বেশি রান তাড়া করে জেতার এমন নজির প্রমাণ করে, আধুনিক ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অবশ্য সব ম্যাচে কিংবা সব উইকেটে ৩৫০ থেকে ৪০০ রান করা সম্ভব নয়। কিন্তু বড় সংগ্রহ গড়ার এবং বড় লক্ষ্য তাড়া করার দক্ষতা এখন শক্তিশালী ওয়ানডে দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

সেই তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাটিং এখন কোথায়?

যেখানে অন্য দলগুলো ৩০০ থেকে ৩৫০ রান করার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে, সেখানে বাংলাদেশের সামনে ২৫০ থেকে ২৭০ রানের লক্ষ্য এলেও জয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের সমর্থকেরা একসময় বিশ্বাস করতেন, দল ২৫০ কিংবা ২৭০ রান করলেও বোলিংয়ের শক্তিতে ম্যাচ জিততে পারে। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটে শুধু বোলিংনির্ভর হয়ে ধারাবাহিক সাফল্য পাওয়া কঠিন। ব্যাটারদেরও বড় সংগ্রহ গড়ার দায়িত্ব নিতে হবে।

একসময় ওয়ানডেই ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি

বাংলাদেশ ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক উত্থানের ইতিহাসে ওয়ানডে সংস্করণের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া, ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে ওঠা এবং বিভিন্ন শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের মধ্য দিয়ে এই সংস্করণেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছিল বাংলাদেশ।

মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একসময় ঘরের মাঠে যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণদের পারফরম্যান্স মিলিয়ে একটি কার্যকর দলীয় সমন্বয় তৈরি হয়েছিল।

বর্তমান বাংলাদেশ অবশ্য পুরোপুরি সাফল্যহীন নয়। ২০২৬ সালে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয় দলটির সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়। কিন্তু ঘরের মাঠের সেই সাফল্য বিদেশের কন্ডিশনে ধরে রাখতে না পারাই উদ্বেগের বিষয়।

বিশেষ করে জিম্বাবুয়ে সফর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাম্প্রতিক ব্যর্থতা দেখিয়েছে, ভিন্ন পরিবেশে ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা এখনো কাটেনি।

দলটির বর্তমান সমস্যাকে তাই শুধু সামর্থ্যের অভাব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং প্রতিভাকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে রূপ দিতে না পারা, কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ঘাটতি এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাটিং সমন্বয় গড়ে তুলতে না পারার বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

ব্যাটিং পজিশন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর কত দিন?

বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে স্থায়ী সমন্বয় তৈরির প্রয়োজনীয়তা এখন সবচেয়ে বেশি। কে ওপেন করবেন, কে তিন নম্বরে খেলবেন এবং কারা মিডল অর্ডারে দায়িত্ব নেবেন—এসব সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে নেওয়া জরুরি।

একজন ওপেনারকে কয়েক ম্যাচ পরপর তিন কিংবা পাঁচ নম্বরে নামিয়ে দেওয়া বা চার নম্বরের ব্যাটারকে হঠাৎ ওপেনিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু নিয়মিত এমন পরিবর্তন একটি স্থিতিশীল ব্যাটিং ইউনিট গড়ে তোলাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

বিশেষ করে মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর বিদায়ের পর মিডল অর্ডারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি পূরণে বিশেষায়িত ব্যাটার তৈরির বিকল্প নেই।

একই সঙ্গে ব্যাটারদের বড় ইনিংস খেলার মানসিকতা এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভালো শুরু পেয়ে ৩০ কিংবা ৪০ রানে আউট হওয়া নয়, ইনিংসকে বড় করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোনো একজন ব্যাটারের ওপর নির্ভর না করে পুরো ব্যাটিং ইউনিটকে দায়িত্ব নিতে হবে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, নির্বাচক প্যানেল এবং কোচিং স্টাফকে তাই শুধু একাদশ পরিবর্তনের মধ্যে সমাধান না খুঁজে ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেই নির্ভরযোগ্য ওপেনার, তিন নম্বর ব্যাটার, মিডল অর্ডার বিশেষজ্ঞ এবং কার্যকর ফিনিশার তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

২০২৭ বিশ্বকাপের আগে বড় প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ সামনে রেখে বাংলাদেশের হাতে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সময়কে কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পিতভাবে দল গড়ে তোলা জরুরি।

শুধু ক্রিকেটার পরিবর্তন কিংবা ব্যাটিং অর্ডারে অদলবদল করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি নির্ভরযোগ্য ওপেনিং জুটি, দায়িত্বশীল মিডল অর্ডার, কার্যকর ফিনিশার এবং বড় লক্ষ্য তাড়া করার আত্মবিশ্বাস।

বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা এমন একটি দল দেখতে চান, যারা ৩০০ রান করার সামর্থ্য নিয়ে মাঠে নামবে। প্রতিপক্ষ ৩০০ রান তুললেও ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে মনে করবে না। আবার ২০০ থেকে ২৫০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় চাপে ভেঙে পড়বে না।

একসময় ওয়ানডে ক্রিকেট ছিল বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় জায়গা। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সেই আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

চার অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের শূন্যতা, ওপেনারদের পজিশন পরিবর্তন, মিডল অর্ডারে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং বিদেশের মাটিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানোর প্রবণতা—সবকিছুই বাংলাদেশের ওয়ানডে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

বিশ্ব ক্রিকেট যখন ৪০০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ইতিহাস লিখছে, তখন বাংলাদেশের সমর্থকেরা কেন ৩০০ রানের স্বপ্ন দেখতেও সংশয়ে ভুগবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই দিতে হবে ক্রিকেটারদের। কারণ বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল সংস্করণ হিসেবে পরিচিত ওয়ানডে ক্রিকেটকে আবার শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মের কাঁধে।

আর সেই প্রত্যাবর্তন শুরু করতে হবে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাটিং লাইনআপ তৈরি করার মধ্য দিয়ে—যেখানে ব্যাটাররা শুধু প্রতিভাবান নন, ধারাবাহিকভাবে ম্যাচ জেতানোর মতো নির্ভরযোগ্যও হবেন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১

লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের দেড় কোটি পাউন্ডের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ

২

জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের তদন্তে জটিলতা, তিনবার চিঠি দিয়েও ডিভাইস পায়নি ডিবি

৩

তিন দশক কাজে ডুবে হারিয়েছেন পরিবারের সময়, বলতে গিয়ে কাঁদলেন আমির

৪

মালয়েশিয়ায় সরকারি কর্মীদের ওয়েজ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, দেশব্যাপী সিদ্ধান্তের আগে যাচাই

৫

সৌদির কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি, দুই মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কপি চেয়ে ঢাকার তৎপরতা

৬

যুবলীগ নেতা সন্দেহে আটক, জামায়াতের চাঁদার রসিদ দেখিয়ে তিন ঘণ্টায় মুক্তি

৭

মালয়েশিয়ায় শিশুদের যৌন শোষণের ভয়াবহ চক্রের সন্ধান, মাসে আয় সাড়ে ৪ লাখ রিঙ্গিত

৮

বাংলাদেশে ৭৭ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরিকল্পনা জাপানের, নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

৯

ওয়ানডে অভিষেকেই বোলিং অ্যাকশন নিয়ে বিতর্ক, আইসিসির পরীক্ষার মুখে আলিস

১০

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের পর নতুন উদ্বেগ, আরও ২০ প্রবাসীর সাজার তথ্য অজানা

১১

শারদীয় দুর্গোৎসবের নিরাপত্তায় অনন্য আনসার-ভিডিপি: প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত নিরাপত্তায় নতুন দৃষ্টান্ত

১২

নবীনগরে তিতাস-বুড়ী নদীতে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন, হাজারো ভক্তের ঢল

১৩

চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, আইসিইউ চালু ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা

১৪

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫ অসহায় ব্যক্তিকে অনুদানের চেক দিলেন এমপি বুলবুল

১৫

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা দেখতে ডিমলায় জনতার ঢল

১৬

​ভোলাহাট সীমান্তে ৫৯ বিজিবি’র অভিযানে ৯০ বোতল ফেন্সিডিল জব্দ

১৭

শার্শায় ১৮টি স্বর্ণের বারসহ একজন গ্রে/ফতার, পালিয়েছে আরও দুজন

১৮

শার্শা ও বেনাপোল শারদীয় দুর্গোৎসবের নিরঞ্জন আজ

১৯

নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপির সহযোগিতায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে ১৫টি স্প্রে মেশিনসহ উপকরণ বিতরণ

২০