সম্পাদকীয় | লিড নিউজ ২৪
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে জাপান। আগামী পাঁচ বছরে দেশের বেসরকারি খাতে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে দেশটি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৭ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাপানের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান করার পরিকল্পনা রয়েছে টোকিওর। বিশেষ করে গাড়ি নির্মাণ, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, অন্যান্য উৎপাদনশিল্প এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে এই বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যবহৃত হতে পারে।
জাপানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনেও নতুন বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দেশে জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে আসতে পারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে কেন্দ্র করে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
সফরের দ্বিতীয় দিন, ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
জাপানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুই প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিতব্য যৌথ বিবৃতিতে প্রস্তাবিত এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে এই পরিকল্পনা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে নতুন গতি
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
আসন্ন সফরে এই চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার আরও বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আলোচনা চলছে। এসব বিষয়ে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে সম্ভাবনা
জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। ঢাকার মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে দেশটির উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা রয়েছে।
নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী বেসরকারি খাতে জাপানের অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, গাড়ি নির্মাণ ও জ্বালানি অবকাঠামোর মতো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ঘোষিত পরিকল্পনা থেকে বাস্তব বিনিয়োগে পৌঁছাতে প্রকল্প নির্বাচন, অর্থায়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দুই দেশের কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মন্তব্য করুন