ঢাকা | ২৩ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাঁদের আইনি পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার। এর মধ্যেই দেশটিতে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রকৃত কারণ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়ের বিস্তারিত জানতে সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিপত্র চেয়েছে ঢাকা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় নিহত বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর তা গ্রহণ করতে বিমানবন্দরে যান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সেখানে তিনি প্রবাসীদের নিরাপত্তা, সৌদিতে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের পরিস্থিতি এবং দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ইতোমধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত ওই দুই ব্যক্তির বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি সরকারের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর মামলার প্রকৃত ঘটনা ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।
এর আগে গত ১৫ অক্টোবর মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠায় জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত না করার বিষয়টিও কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদ এলাকায় কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, বিচার চলাকালে তাঁদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো বাংলাদেশের হাতে আসেনি।
এদিকে সৌদি আরবের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশটির সরকার বিভিন্ন সময়ে কারাবন্দি ও সাজাপ্রাপ্ত বিদেশি নাগরিকদের তালিকা সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করে। এসব তথ্য পর্যালোচনার পাশাপাশি বন্দিদের আইনি অবস্থা এবং সম্ভাব্য সহায়তার সুযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ অন্য দেশের বিচারিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তবে বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার, দণ্ডিত কিংবা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হলে তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তার ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব।
কারাবন্দিদের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করে। প্রয়োজন অনুযায়ী কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সাজা মওকুফ বা অন্যান্য আইনি সুযোগের বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
হুতিদের হামলায় নিহত শাহেদের মরদেহ দেশে ফিরল
অন্যদিকে সৌদি আরবে সশস্ত্র হুতি গোষ্ঠীর হামলায় নিহত প্রবাসী বাংলাদেশি মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ শুক্রবার সকালে দেশে পৌঁছেছে। সকাল আটটার পর মরদেহ বহনকারী বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
পরে সরকারের পক্ষ থেকে মরদেহ ও আর্থিক সহায়তা শাহেদের স্ত্রী কহিনুর আক্তার কাকলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের বাসিন্দা শাহেদ সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে প্লাম্বার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশে ছুটি কাটিয়ে রিয়াদ হয়ে জেদ্দায় কর্মস্থলে ফেরার পথে গত ১০ অক্টোবর কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার শিকার হন তিনি।
ওই হামলায় শাহেদের পাশাপাশি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার আরেক বাংলাদেশি মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরিও নিহত হন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে গত ছয় মাসে নিহত ১১ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে শাহেদ সর্বশেষ ব্যক্তি। গত এক মাসে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। অন্যদের মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
প্রবাসীদের নিরাপত্তায় কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার
সৌদি আরবে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে আটকে পড়া বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি ও নবায়নের বিষয়েও সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে প্রবাসীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়েও তিনি সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিটি মিশনের শ্রমকল্যাণ শাখার দায়িত্ব প্রবাসীদের অভিযোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া। দায়িত্ব পালনে কোনো মিশনের কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির কর্মসংস্থান এবং দেশটির কারাগারে হাজারো নাগরিকের অবস্থানের প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা, কনস্যুলার সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক জবাব এবং আদালতের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর ঢাকার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
মন্তব্য করুন