সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া বন্দির তালিকায় ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ উল্লেখ থাকলেও শাস্তির ধরন নেই, বিস্তারিত জানতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের
সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তৈরি হওয়া উদ্বেগের মধ্যেই সামনে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেশটির বিভিন্ন কারাগারে আটক আরও ২০ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে আদালতের রায় হলেও তাঁদের কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পায়নি বাংলাদেশ। সৌদি কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা বন্দিদের তালিকায় তাঁদের ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সাজার ধরন ও মেয়াদের ঘর ফাঁকা রাখা হয়েছে।
গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়েছে। এর মধ্যেই নতুন করে আরও ২০ প্রবাসীর সাজার তথ্য অজানা থাকার বিষয়টি সামনে আসায় দেশটিতে বন্দি বাংলাদেশিদের বিচারপ্রক্রিয়া, কনস্যুলার সহায়তা এবং আইনি সুরক্ষা নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে ২ হাজার ৪৬১ বাংলাদেশি বন্দির একটি তালিকা সরবরাহ করে। তালিকাটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অন্তত ২২ বাংলাদেশির নামের পাশে দণ্ডপ্রাপ্ত লেখা থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়ের বিবরণ উল্লেখ করা হয়নি।
ওই ২২ জনের মধ্যেই ছিলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার, যাঁদের মৃত্যুদণ্ড গত ১৪ অক্টোবর কার্যকর করা হয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের সাজা সম্পর্কে বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা জেদ্দার কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ।
আগের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় যা জানা গেছে
এর আগে লিড নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেয় দেশটির আদালত।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির ভিত্তিতে ১৪ অক্টোবর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কাছে আগে থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য ছিল না।
পরবর্তী সময়ে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের পাঠানো নথিতে দেখা যায়, নজরুল ইসলামকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত আইনের অভিযোগে এবং সুইটি আক্তারকে পরদিন ব্যভিচারের অভিযোগে আটক করা হয়েছিল। অথচ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সৌদি কর্তৃপক্ষ মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা জানায়।
আটকের সময় নথিভুক্ত অভিযোগ এবং পরবর্তী মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণায় উল্লিখিত অভিযোগের মধ্যে কী সম্পর্ক রয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার হয়নি। এ অবস্থায় বিচারিক রায় ও মামলার বিস্তারিত নথি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ।
আরও ২০ বাংলাদেশির ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাজার বিবরণ অনুপস্থিত থাকা ২২ জনের মধ্যে আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা, পাঁচজনের বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং পাঁচজনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অধিকারসংক্রান্ত মামলা রয়েছে। অন্যদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন, একজনের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং একজনের বিরুদ্ধে ব্যভিচারসংক্রান্ত মামলা রয়েছে।
এসব বন্দির ছয়জন জেদ্দার জাহবান কারাগারে, ছয়জন শুমাইসি কারাগারে এবং চারজন জেদ্দা জেনারেল কারাগারে রয়েছেন। বাকি ছয়জন সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকার কারাগারে ছিলেন বলে পাওয়া তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ হিসেবে উল্লেখ থাকার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কেউ কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হতে পারেন, আবার কোনো মামলায় আরও কঠোর সাজাও হতে পারে। আদালতের রায়ের অনুলিপি ছাড়া প্রকৃত শাস্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ
বন্দিদের সাজার তথ্য নিশ্চিত করতে গত ১৯ অক্টোবর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
চিঠিতে বাংলাদেশি বন্দিদের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের বিস্তারিত বিবরণ দ্রুত সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়, যাতে তাঁদের যথাযথ কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. শাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সেবা ও আইনি স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতেই সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এদিকে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় গত ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশ সরকার। তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং বাংলাদেশকে আগাম অবহিত না করার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিপুলসংখ্যক একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের শ্রম, ফৌজদারি ও অন্যান্য আইনগত জটিলতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিদের মামলার অবস্থা, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার বিষয়ে সময়মতো তথ্য পাওয়ার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
বিশেষ করে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের সাজার তথ্য বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে না পৌঁছানোর ঘটনায় কনস্যুলার যোগাযোগব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এখন আরও ২০ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে ঘোষিত সাজার ধরন অজানা থাকায় সেই উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ঠিক কী রায় দেওয়া হয়েছে, তাঁদের আপিলের সুযোগ রয়েছে কি না এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।
নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনার পর নতুন এই তথ্য দেশটিতে বন্দি বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা এবং কূটনৈতিক তদারকি আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মন্তব্য করুন