সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে নিজের প্রকৃত পদমর্যাদা গোপন করে ডিআইজি পরিচয়ে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার এবং অনুমতি ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের আগে কর্মস্থল ত্যাগসহ একাধিক অসদাচরণের অভিযোগে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) টুটুল চক্রবর্তীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার।
বুধবার (৭ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাঁর বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এবং সরকারি চাকরির শৃঙ্খলাবিধি লঙ্ঘনের কারণে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, টুটুল চক্রবর্তী সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। তাঁকে চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি থেকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের নভেম্বরে। ওই বছরের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতিসহ দুই দিনের ছুটি এবং ১৬ থেকে ১৮ নভেম্বর তিন দিনের নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছিল তাঁর। তবে নির্ধারিত ছুটি শুরুর আগেই ১৩ নভেম্বর প্রয়োজনীয় প্রস্থান প্রতিবেদন দাখিল না করে তিনি কর্মস্থল ছেড়ে যান।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেদিন নিজের অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদা গোপন করে তিনি ডিআইজি পরিচয় দেন এবং রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ডিআইজি লাউঞ্জের সুবিধা গ্রহণ করেন। পরে সকাল আনুমানিক ১০টা ২০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর আগেও একাধিকবার নিজেকে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি পরিচয় দিয়ে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করেছিলেন টুটুল চক্রবর্তী। তাঁর এসব কর্মকাণ্ড বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসে।
সরকারের মূল্যায়নে, একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার এ ধরনের আচরণ শুধু প্রশাসনিক নিয়মের পরিপন্থী নয়, বরং জনসাধারণের কাছে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করেছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো লিখিত জবাব দেননি। এমনকি জবাব দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়েও আবেদন করেননি।
পরবর্তী সময়ে ২ এপ্রিল অভিযোগ তদন্তে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে ৭ মে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেওয়া হয়।
তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে ১৬ জুন তাঁকে দ্বিতীয়বার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কেন চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও এবারও তিনি কোনো জবাব দেননি।
এরপর তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগের বিবরণ ও প্রাসঙ্গিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মতামত চাওয়া হলে গত ১৪ সেপ্টেম্বর কমিশনও বরখাস্তের পক্ষে সুপারিশ করে।
পরবর্তী ধাপে বিষয়টি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। গত ৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি বরখাস্তের প্রস্তাবে অনুমোদন দেন। এরপর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসারে টুটুল চক্রবর্তীকে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়নে, তাঁর কর্মকাণ্ড সরকারি দায়িত্ব পালনে গুরুতর অবহেলা, আইনানুগ নির্দেশ অমান্য এবং চাকরির শৃঙ্খলার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এসব কারণেই বিভাগীয় তদন্ত ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন