কাজী স্বাধীন “স্টাফ রিপোটার :-
নওগাঁ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অভিযানে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ও একটি আইফোনসহ সাতটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া লুণ্ঠিত অর্থের মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারানোর পর অর্থের ঘাটতি পূরণ করতে এ ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের তিন কর্মী।
পুলিশ জানায়, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্যাশিয়ার নাজমুল ও অফিস সহায়ক রাসেল বাবু এজেন্ট ব্যাংকের মালিক ফিরোজ হোসেনের কাছ থেকে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে করে আবাদপুকুর বাজারে অফিসের উদ্দেশে রওনা হন। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে রানীনগর উপজেলার পারইল বাজার পার হয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁদের পথরোধ করে। এ সময় লোহার পাইপ দিয়ে ক্যাশিয়ার নাজমুলকে মারধর করে টাকাগুলো নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে জেলা গোয়েন্দা শাখার ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক হাসিবের নেতৃত্বে ডিবির একটি বিশেষ দল ও রানীনগর থানা-পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ঘটনার প্রাথমিক সূত্র উদ্ঘাটন করা হয়।
ঘটনার দিন রাতেই অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়। এ সময় মোটরসাইকেলটির মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরদিন ৭ অক্টোবর পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে ডিবির একটি বিশেষ দল জয়পুরহাটের আক্কেলপুর ও দিনাজপুরে অভিযান চালায়। পরে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় জড়িত স্বপন (২৮) ও হাসান আলীকে (২৫) গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা দুজনই নওগাঁর রানীনগর উপজেলার বিশিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁদের হেফাজত থেকে ছিনতাই হওয়া ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার দুজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবর রানীনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আরও তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন—অফিস সহায়ক রাসেল বাবু (২২), ঋণ কর্মকর্তা সুজন (২৭) ও ঋণ কর্মকর্তা আবু তালেব (২২)। তাঁদের বাড়ি রানীনগর উপজেলার অলংকারদীঘি ও সিমলাদার গ্রামে।
অনলাইন জুয়ায় লোকসান, এরপর ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা- পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কর্মী রাসেল বাবু, সুজন ও আবু তালেব কয়েক মাস ধরে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারান। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে অনলাইন জুয়ায় ব্যবহার করে হারিয়ে ফেলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এজেন্ট ব্যাংকের মালিক ফিরোজ হোসেনের টাকা ছিনতাই করে অর্থের ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করেন তাঁরা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পরিকল্পনায় স্বপন, হাসানসহ আরও কয়েকজনকে যুক্ত করা হয়। প্রায় এক মাস ধরে তাঁরা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। ঘটনার দিন অফিস সহায়ক রাসেল বাবু ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আনতে যান। টাকা নিয়ে ফেরার পথে তিনি মুঠোফোনে ছিনতাইয়ে জড়িত ব্যক্তিদের তাঁদের অবস্থান ও চলাচলের তথ্য জানাতে থাকেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে স্বপন, হাসানসহ অন্যরা তাঁদের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করেন। এরপর ক্যাশিয়ার নাজমুলকে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যান তাঁরা। পুলিশের দাবি, অফিস সহায়ক রাসেল বাবু এ ঘটনায় নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করলেও তিনি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ছিনতাই করা অর্থের একটি অংশ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের তিন কর্মীর পাওয়ার কথা ছিল। বাকি টাকা অন্য সহযোগীদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ছিনতাইয়ের পর স্বপন ও হাসানকে প্রাথমিকভাবে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়। তাঁদের নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়। পরে তাঁরা জয়পুরহাট হয়ে দিনাজপুরে চলে যান। সেখান থেকেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ও একটি আইফোনসহ সাতটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে লুণ্ঠিত অর্থের মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা। পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার ও বাকি টাকা উদ্ধারে পুলিশের অভিযান ও তদন্ত চলমান রয়েছে।
মন্তব্য করুন