সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের প্রথম দিন দুর্দান্ত শুরুর পরও বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান তামিমের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে প্রথম সেশনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর ম্যাচে ফিরে আসে আফগানিস্তান। আর এই ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম নায়ক পেসার ইয়ামিন আহমদজাই। নিখুঁত লাইন-লেংথ ও রিভার্স সুইংয়ের কার্যকর ব্যবহারে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে চাপ তৈরি করেন তিনি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেন দুই ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও সাদমান ইসলাম। তাঁদের ১২৪ রানের উদ্বোধনী জুটিতে বড় সংগ্রহের ভিত পেয়ে যায় টাইগাররা। বিশেষ করে তানজিদ ৭১ বলে ৮৩ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে আফগান বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
তবে মধ্যাহ্নভোজের পর বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। প্রথম সেশনে বাংলাদেশের ব্যাটাররা দ্রুত রান তুললেও দ্বিতীয় সেশনে আফগান পেসাররা নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। এই সময় মুমিনুল হক ও অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমকে ফিরিয়ে আফগানিস্তানের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করেন আহমদজাই।
দিনের খেলা শেষে আফগান এই পেসার জানান, শুরুতে বাংলাদেশের ব্যাটাররা আক্রমণাত্মক থাকলেও নিজেদের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার কোনো চিন্তা ছিল না তাঁদের। বরং ধারাবাহিকভাবে একই জায়গায় বল করে ব্যাটারদের ভুলের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
আহমদজাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম সেশনে বাংলাদেশের ব্যাটাররা দ্রুত রান তুলছিলেন। কিন্তু আফগান বোলাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ব্যাটাররা যেভাবেই খেলুন না কেন, নিজেদের নির্ধারিত লাইন ও লেংথ বজায় রাখবেন। শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলই কাজে দিয়েছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিমকে আউট করার পেছনেও ছিল বিশেষ পরিকল্পনা। আহমদজাই জানান, শুরুতে অফ স্টাম্পের বাইরে নিয়মিত বল করে মুশফিককে শট খেলতে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু মুশফিক সহজে সেই ফাঁদে পা দেননি। পরে অপেক্ষাকৃত সোজা লাইনে একটি বল করেন, যা রিভার্স সুইং হয়ে উইকেট এনে দেয়।
আফগান পেসারের বোলিংয়ে রিভার্স সুইংয়ের ব্যবহার ছিল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও পুরোনো বলকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। আহমদজাই জানান, রিভার্স সুইং আয়ত্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে কবজির অবস্থান ও বল ছাড়ার কৌশল নিয়ে কাজ করছেন।
আফগানিস্তানের উইকেট সাধারণত পেস বোলারদের জন্য খুব বেশি সহায়ক নয়। সে কারণে বোলিংয়ে নতুন নতুন কৌশল যোগ করার প্রয়োজন অনুভব করেন আহমদজাই। দেশের কোচদের সঙ্গে কাজ করে ক্রিজের অপেক্ষাকৃত বাইরের দিক থেকে বল করার বিশেষ কৌশলও রপ্ত করেছেন তিনি।
তাঁর ব্যাখ্যায়, অনেক পেসার ক্রিজের বাইরের দিক থেকে বল করে সেটিকে ব্যাটারের ভেতরের দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তবে তিনি একই ধরনের অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করে বলকে বাইরের দিকে সরিয়ে নেওয়ার দক্ষতা বাড়িয়েছেন। এর সঙ্গে রিভার্স সুইং যোগ হওয়ায় ব্যাটারদের জন্য তাঁর বল মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
শুধু বল হাতে নয়, ফিল্ডিংয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন আহমদজাই। দিনের শেষ দিকে বাউন্ডারির কাছে দারুণ একটি ক্যাচ নিয়ে লিটন দাসকে ফিরিয়ে দেন তিনি। অর্ধশতক পূরণের পর লিটনের বিদায়ে বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা আরও ধাক্কা খায়।
নিজের ক্যাচ প্রসঙ্গে আহমদজাই বলেন, ক্যারিয়ারে অনেক ক্যাচ ধরলেও দিনের শেষ ভাগে নেওয়া এই ক্যাচটি তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে সুযোগটি কাজে লাগাতে পেরে সন্তুষ্ট তিনি।
প্রথম দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮৪ ওভারে ৮ উইকেটে ৩১৭ রান। তানজিদ হাসান তামিমের পাশাপাশি সাদমান ইসলাম ও লিটন দাস অর্ধশতক করেন। অন্যদিকে আফগানিস্তানের মোহাম্মদ সালিম, ইয়ামিন আহমদজাই ও ইসমত আলম মিলে বাংলাদেশের আট উইকেটের সাতটি শিকার করেন। আহমদজাই ১৬ ওভারে ৬২ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে নিজের বোলিং দক্ষতা উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জানিয়ে আহমদজাই বলেন, নিয়মিত অনুশীলন ও কঠোর পরিশ্রমই তাঁর সাফল্যের মূল ভিত্তি। নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেন তিনি।
প্রথম দিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক শুরু এবং আফগানিস্তানের পাল্টা আক্রমণ—দুই দলের সামর্থ্যই সামনে এসেছে। তবে শুরুতে বিনা উইকেটে ১২৪ রান তুলে ফেলার পরও আট উইকেট হারিয়ে দিন শেষ করায় কিছুটা আক্ষেপ থাকতেই পারে বাংলাদেশের। অন্যদিকে পরিকল্পিত পেস বোলিংয়ের মাধ্যমে ম্যাচে ফিরে এসে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে আফগানিস্তান।
এখন দ্বিতীয় দিনের শুরুতে বাংলাদেশের লক্ষ্য থাকবে শেষ দুই উইকেটে যতটা সম্ভব রান যোগ করা। আর আফগানিস্তান চাইবে দ্রুত বাকি উইকেট তুলে নিয়ে প্রথম ইনিংসে নিজেদের ব্যাটিং শুরু করতে। ফলে পরের দিনের প্রথম সেশন দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন