সায়মন খান | নিউজ টোয়েন্টি ফোর
বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। প্রয়াত অভিনেতাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি মন্তব্য ঘিরে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। বিষয়টি নিয়ে এবার প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছে অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন (এআইসিডব্লিউএ)। সংগঠনটির দাবি, একজন মানুষের মৃত্যুর পর এমন মন্তব্য শুধু অমানবিকই নয়, চলচ্চিত্র অঙ্গনের শিষ্টাচারেরও পরিপন্থী।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে ভারতের গোয়ায় নিজ বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৭৫ বছর বয়সী অভিনেতা নানা পাটেকর। তাঁর মৃত্যুতে বলিউডসহ ভারতের বিভিন্ন অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহকর্মী ও ভক্তরা যখন তাঁকে স্মরণ করছেন, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তনুশ্রী দত্ত। সেখানে তিনি ‘ইভিল ডেড’ বা ‘অশুভের মৃত্যু’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ভিডিওতে তনুশ্রী জানান, তিনি নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর শুনেছেন। তবে সেদিন লক্ষ্ণৌতে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান থাকায় নিজের কাজেই মনোযোগ দিতে চান। মৃত্যুর ঘটনায় কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাবেন, সেটি বুঝে ওঠার পর বিস্তারিত কথা বলবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে নানা পাটেকরের পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানান অভিনেত্রী।
তবে তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় সমালোচনা। বিশেষ করে প্রয়াত অভিনেতাকে ইঙ্গিত করে ব্যবহৃত শব্দ এবং মৃত্যুর দিন নিজের পেশাগত ব্যস্ততার প্রসঙ্গ টেনে আনার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
বিতর্কের মধ্যেই শুক্রবার (৯ অক্টোবর) তনুশ্রীর মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বিবৃতি দেন অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সুরেশ শ্যামলাল গুপ্তা। সংগঠনটির অভিযোগ, একজন কিংবদন্তি অভিনেতার মৃত্যুতে চলচ্চিত্রজগৎ যখন শোকাহত, তখন এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত আপত্তিকর ও সংবেদনশীলতার অভাবের পরিচায়ক।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যক্তিগত বিরোধ বা অতীতের কোনো ঘটনা থাকলেও একজন মানুষের মৃত্যুর পর বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন। কাউকে নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে অবমাননাকর মন্তব্য করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তনুশ্রীর উদ্দেশে সংগঠনটি আরও জানায়, তাঁর লক্ষ্ণৌর অনুষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত কর্মসূচি নিয়ে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু একজন প্রখ্যাত শিল্পীর মৃত্যুর দিনে নিজের কাজের পরিকল্পনাকে সামনে এনে এমন মন্তব্য করা অনভিপ্রেত। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কখন কথা বলতে হবে এবং কখন নীরব থাকা উচিত, সে বিষয়ে সচেতন থাকারও আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে সমালোচনার মুখেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি তনুশ্রী। পরবর্তী সময়ে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে অশুভের অবসানের কথা উল্লেখ করে নিজের জীবনে ভালো কিছু ঘটার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে যৌন হয়রানির অভিযোগের অভিজ্ঞতা ও ভুক্তভোগীদের মানসিক ক্ষতির বিষয়েও অন্যের একটি পোস্ট শেয়ার করেন তিনি।
নানা পাটেকর ও তনুশ্রী দত্তের বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালে ভারতে ‘মি টু’ আন্দোলনের সময় তনুশ্রী অভিযোগ করেন, ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ সিনেমার শুটিং চলাকালে নানা পাটেকর তাঁকে যৌন হয়রানি করেছিলেন। অভিযোগটি সে সময় ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
যদিও শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন নানা পাটেকর। পরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশি তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৯ সালে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে মামলাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ২০২৫ সালে নির্ধারিত আইনি সময়সীমা অতিক্রমের কারণে সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি কার্যক্রম খারিজ করেন মুম্বাইয়ের একটি আদালত।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’ ও ‘ওয়েলকাম’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন নানা পাটেকর। শক্তিশালী সংলাপ, ব্যতিক্রমী অভিনয়শৈলী এবং চরিত্রের গভীরতা ফুটিয়ে তোলার দক্ষতার জন্য তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। অভিনয়ে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও পদ্মশ্রী সম্মাননাও পান তিনি।
তবে তাঁর মৃত্যুর পর তনুশ্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামনে এসেছে তাঁদের দীর্ঘদিনের বিরোধ। একদিকে প্রয়াত অভিনেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রশ্ন, অন্যদিকে অতীতের যৌন হয়রানির অভিযোগ ও ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা—এই দুই বিষয়কে ঘিরে ভারতীয় বিনোদন অঙ্গনে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
মন্তব্য করুন