সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজীবী ও বিচারপতি নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে তাঁকে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ভাতনে ফ্রিদনেস। ৮৫ বছর বয়সী পিল্লাইকে শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য এ সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় পিল্লাইয়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে জন্ম নেন নাভি পিল্লাই। বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠা এই নারী বৈষম্য ও নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েও আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নেলসন ম্যান্ডেলাসহ রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াইয়েও ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রুয়ান্ডাবিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারপতি হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। এর ফলে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়।
বাংলাদেশের জন্যও এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার করা মামলায় অ্যাডহক বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাভি পিল্লাই। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভিযানের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাঁদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিচার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে।
এই মামলায় পিল্লাইয়ের সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন। রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যক্রম বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন পিল্লাই। আন্তর্জাতিক সংঘাত ও মানবিক সংকটের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পক্ষে তাঁর অবস্থান বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান পুরস্কার ঘোষণার সময় বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা বর্তমানে প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনের শাসনের পরিবর্তে শক্তির রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পিল্লাইয়ের দীর্ঘদিনের কাজ বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যায়বিচার অপরিহার্য।
কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক আদালত ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে এবারের পুরস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বিশ্বে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং অপরাধের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মোট ২৮৭টি মনোনয়ন জমা পড়ে। এর মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন ছিল। যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন শেষে নাভি পিল্লাইকে চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। পুরস্কারের অংশ হিসেবে তিনি স্বর্ণপদক, সনদ এবং ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা অর্থমূল্য পাবেন।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে নাভি পিল্লাইয়ের এই স্বীকৃতি মানবাধিকার সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
মন্তব্য করুন