ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে সেবা প্রদানের কাজে শোষণের উদ্দেশ্যে মানুষকে পাচার, দাসত্ব বা দাসত্বের মতো কর্মকাণ্ড, জোরপূর্বক শ্রম এবং অন্যান্য বেআইনি কাজে নিয়োজিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশন আরও অভিযোগ করেছে, এসব ঘটনায় গুরুতর পরিস্থিতি ছিল, যার মধ্যে রয়েছে ভুক্তভোগীদের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নেওয়া, আস্থা বা কর্তৃত্বের অবস্থানের অপব্যবহার এবং ১১ হাজার ৬৪৬ দশমিক ৮৭ ইউরোর বেশি অর্থ উপার্জন।
এ ছাড়া কয়েকজনের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৫ হাজার ইউরোর বেশি অর্থ নেওয়া, প্রতারণায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কিছু সামগ্রী রাখা, জবরদস্তি বা মানসিক চাপ প্রয়োগ এবং ব্যক্তিদের অর্থ, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সুযোগে প্রবেশাধিকার সীমিত করার অভিযোগও রয়েছে ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে।
তিনি জেনেশুনে মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া, জাল নথি তৈরি বা ব্যবহার এবং কয়েকজন ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়ার বিষয়টি জবসপ্লাসকে না জানানোর অভিযোগেও অভিযুক্ত হয়েছেন।
পুলিশ পরে ইস্তিয়াককে শনাক্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে তল্লাশি চালায়।
ইস্তিয়াককে তার রেস্টুরেন্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তিনি বুকে ব্যথা এবং উচ্চ রক্তচাপের অভিযোগ করেন। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আদালতে আসামিপক্ষ জানায়, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে ওই রেস্টুরেন্টের বিষয়ে জবসপ্লাসের একটি ডিআইআর প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। প্রসিকিউশন জানায়, একই বিষয়ে একটি পরিদর্শনও চলছিল।
নিজেকে একজন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়া ইস্তিয়াক তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
জামিনে প্রসিকিউশনের তীব্র আপত্তি
আসামিপক্ষ জামিনের আবেদন করলেও প্রসিকিউশন এতে তীব্র আপত্তি জানায়। তারা মানবপাচারের অভিযোগের গুরুতরতার কথা উল্লেখ করে বলে, কথিত ভুক্তভোগীরা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন এবং তাদের সাক্ষ্য এখনো নেওয়া হয়নি।
ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত ইউরোপের দ্বীপ রাষ্ট্র দেশ মাল্টায় মানবপাচার ও শ্রমশোষণের অভিযোগে এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে দেশটির আদালত। তার বিরুদ্ধে অভিবাসী শ্রমিকদের মাল্টায় নিয়ে গিয়ে বেতন না দিয়ে মানবপাচার, অর্থপাচার, প্রতারণা, জবরদস্তি, নথিসংক্রান্ত অপরাধসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশন আরও দাবি করে, বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে ইস্তিয়াকের ব্যাপক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারেন।
প্রসিকিউশনের একজন পরিদর্শক আদালতকে বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি কথিত ভুক্তভোগীদের ওপর যে মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে, এমন ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি।
প্রসিকিউশন আরও জানায়, তারা মনে করে ইতিমধ্যে সামনে আসা পাঁচজনের বাইরেও আরও ভুক্তভোগী থাকতে পারেন।
এর বিপরীতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, কঠোর জামিনের শর্তের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তারা ইলেকট্রনিক ট্যাগের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক নজরদারি চালুর প্রস্তাব দেন এবং বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা ও একটি সুরক্ষা আদেশ একসঙ্গে কার্যকর করা হলে কথিত ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
আসামিপক্ষ আরও জানায়, জামিন দেওয়া হলে ইস্তিয়াক তার স্ত্রীকে নিয়ে মেলিয়েহায় থাকা বাড়িতে অবস্থান করতে পারবেন।
তবে প্রসিকিউশন এতে আপত্তি জানিয়ে আদালতকে বলে, ইস্তিয়াককে তার রেস্টুরেন্টে ঘুমাতে দেখা গেছে। তাদের দাবি, তিনি কথিত ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা তাদের হুমকি দিতে পারেন—এমন ঝুঁকি এখনো যথেষ্ট রয়েছে।
আদালত জামিনের আবেদন নাকচ করে ইস্তিয়াককে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
প্রসিকিউশনের আবেদনের পর আদালত ইস্তিয়াকের সম্পদের ওপর ফ্রিজিং অর্ডারও জারি করেন। একই সঙ্গে কথিত ভুক্তভোগীদের পক্ষে একটি সুরক্ষা আদেশ জারি করা হয়।
পরিদর্শক জন স্পিতেরি ও রায়ান মারিও ভেলা মামলাটি পরিচালনা করেন। তাদের সহায়তা করেন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের আইনজীবী রামন বন স্ল্যাডেন ও শারমেইন আবদিলা।
আসামিপক্ষে আইনজীবী নিকোলাস মিফসুদ ও নিকোল ফালজন আদালতে উপস্থিত ছিলেন । ম্যাজিস্ট্রেট অ্যাবিগেইল ক্রিতিয়েন মামলাটির শুনানি পরিচালনা করেন।
মাল্টার মেলিয়েহায় বসবাসকারী ৪১ বছর বয়সি বাংলাদেশি নাগরিক নাজমুল ইস্তিয়াককে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) গ্রেপ্তার অবস্থায় আদালতে হাজির করা হয়। তার বিরুদ্ধে শ্রমশোষণের উদ্দেশ্যে মানবপাচার, অর্থপাচার, প্রতারণা, জবরদস্তি, নথিসংক্রান্ত অপরাধ এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সূত্র : ইনফোমাইগ্র্যান্টস, মাল্টা টু ডে
অভিযোগের তদন্ত শুরু হয় কয়েকজন ভুক্তভোগী জানানোর পর। তাদের দাবি, ইস্তিয়াক একটি রেস্টুরেন্টে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বাংলাদেশ থেকে মাল্টায় নিয়ে এসেছিলেন।
প্রসিকিউশন আদালতে দাবি করে, পুরো ঘটনাটি এমন একটি ব্যবস্থার অংশ ছিল, যেখানে শ্রমিকদের মাল্টায় গিয়ে চাকরি পাওয়ার ‘আমেরিকান ড্রিম’ দেখানো হয়েছিল।
তাদের দাবি, চার মাসেরও বেশি সময় কাজ করলেও তারা কোনো বেতন পাননি। তারা আরও অভিযোগ করেন, রেস্টুরেন্টটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকত। ফলে যে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের মাল্টায় আনা হয়েছিল, সেটিও তারা নিয়মিতভাবে করতে পারেননি।
এক পর্যায়ে শ্রমিকদের একজন ইস্তিয়াকের সঙ্গে দেখা করলে তাকে তিনটি নথিতে স্বাক্ষর করতে বলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে একটি নথিতে উল্লেখ ছিল, ওই শ্রমিক তিন মাস বিনা বেতনে ছুটিতে থাকবেন।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মোট পাঁচজন ভুক্তভোগী ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে প্রতারণা বা শোষণের অভিযোগ করেছেন। তবে তাদের ধারণা, এখনো শনাক্ত না হওয়া আরও ভুক্তভোগী থাকতে পারেন।
তদন্তকারীদের একজনকে এক শ্রমিক জানান, তিনি চার মাস ডিশওয়াশার হিসেবে কাজ করেছেন, কিন্তু এক সেন্টও বেতন পাননি।
মন্তব্য করুন