সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে পুলিশের তালিকাভুক্ত ডাকাত সর্দার সাহেব আলীকে। প্রথম দফায় গুলিবিদ্ধ হয়ে পাশের খালে পড়ে যাওয়ার পরও তাঁকে লক্ষ্য করে আরও কয়েকটি গুলি ছোড়ে হামলাকারীরা। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে উঠে এসেছে এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ দৃশ্য। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, নিজেদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে সাহেব আলীর পরিচিত সহযোগীরাই তাঁকে হত্যা করেছেন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আটি ওয়াপদা কলোনির বউবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত সাহেব আলী (৫০) ওই এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলাসহ অন্তত ২০টি মামলা রয়েছে।
ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, বউবাজার এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে একজন অস্ত্রধারী সাহেব আলীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি পাশের খালে পড়ে যান। এরপরও হামলাকারীরা থেমে থাকেননি। খালে পড়ে থাকা সাহেব আলীকে লক্ষ্য করে আরও কয়েক দফা গুলি চালানো হয়।
ভিডিও ফুটেজে অন্তত দুজনকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায়। গুলি চালানোর পর হামলাকারীদের খালের পানিতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতেও দেখা গেছে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজনকে খালের মধ্যে পড়ে যাওয়া সাহেব আলীকে খুঁজতে দেখা যায়।
পরে স্থানীয় লোকজন গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছে না পুলিশ।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদুল হক জানিয়েছেন, বউবাজার এলাকায় দুই অস্ত্রধারী সাহেব আলীকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। ঘটনার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত সাহেব আলী দীর্ঘদিন ধরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন। তিনি পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ডাকাত সর্দার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে এর আগে একাধিকবার পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সাহেব আলী ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ডাকাতি, ছিনতাই, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। এর আগে তাঁকে গ্রেপ্তারের অভিযানের সময় সহযোগীদের হামলার মুখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সাহেব আলীর পূর্বপরিচিত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে রনি ও আসলাম নামের দুজনের নাম পাওয়া গেলেও তাঁদের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে সাহেব আলী হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। কয়েকটি স্থানীয় প্রতিবেদনে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই বিরোধই হত্যার মূল কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সাহেব আলীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, নাকি তাৎক্ষণিক সংঘর্ষের জের ধরে গুলির ঘটনা ঘটেছে—এ বিষয়গুলোও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি এবং একাধিকবার গুলি চালানোর দৃশ্য পাওয়া যাওয়ায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। অভিযুক্তদের পরিচয়, ঘটনার নেপথ্যের বিরোধ এবং হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার পর প্রকৃত ঘটনা আরও স্পষ্ট হবে।
নারায়ণগঞ্জের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পারস্পরিক বিরোধের জেরে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান এবং ঘটনার নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন