সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ সংকট ও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগের মধ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং গ্যাসের সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশের সব জেলা প্রশাসককে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের বেশি মূল্যে এলপিজি বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে সরকারের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
তিনি জানান, দেশে এলপিজির সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে জ্বালানি বিভাগ সব জেলা প্রশাসকের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছে। বৈঠকে গ্যাসের বাজারে অনিয়ম চিহ্নিত করা, সরবরাহের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ এবং নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করতে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সরকারের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি জেলার প্রশাসককে নিজ নিজ এলাকার এলপিজি পরিবেশক ও ডিলারদের বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। গ্যাস আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ফ্র্যাঞ্চাইজি, মাস্টার ফ্র্যাঞ্চাইজি, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কী পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের দ্রুত স্থানীয় এলপিজি ব্যবসায়ী ও পরিবেশকদের সঙ্গে বৈঠকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব বৈঠকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গ্যাসের চাহিদা, সরবরাহ, মজুত ও বাজারজাতকরণের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে।
বিশেষ করে কোনো কোম্পানি থেকে সরবরাহ করা গ্যাসের পরিমাণ এবং মাঠপর্যায়ে পরিবেশক বা ডিলারের হাতে পৌঁছানো গ্যাসের হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেলে তা আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। সরবরাহব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে অস্বাভাবিক ঘাটতি বা তথ্যের অসংগতি পাওয়া গেলে বিষয়টি দ্রুত জ্বালানি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলা প্রশাসনের সংগৃহীত তথ্য সমন্বয় করে এলপিজির সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে গ্যাসের সরবরাহ কোথায়, কী পরিমাণে এবং কোন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।
এদিকে চলতি অক্টোবর মাসে এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের মূল্য ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। সরকারি মূল্য নির্ধারণের পরও বাজারে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ এবং সরবরাহসংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই কমিশন বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের এই ঘোষণায় গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের বাজার তদারকি জোরদার করার সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে হিসাব যাচাইয়ের উদ্যোগ কার্যকর হলে কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে কিংবা সরবরাহে অনিয়ম রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে।
তবে সরকারের এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের ফল কতটা দ্রুত সাধারণ ভোক্তারা পাবেন, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের তদারকি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা এবং গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর।
এলপিজির বাজারে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থার অনিয়ম রোধ করাই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মন্তব্য করুন