পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ শুরুর অনুমোদন দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সব পরীক্ষা সফল হলে বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
ঢাকা, ২৯ অক্টোবর ২০২৬: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন ইতিহাস গড়ার আরও এক ধাপ এগিয়েছে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশের অনুমতি মিলেছে। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় গ্রিডে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সরবরাহের পথ আরও প্রশস্ত হলো।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ বা ‘সি-স্টেজ’ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)।
এর আগে প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় ভৌত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, নতুন পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। চুল্লির শক্তি ধাপে ধাপে বাড়ানোর পাশাপাশি টারবাইন, জেনারেটর, শীতলীকরণ এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সক্ষমতাও যাচাই করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে স্বল্পমাত্রায় পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন শুরু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে চুল্লির ক্ষমতা বাড়ানো হবে। প্রথম ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে।
সব কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া নির্ভর করবে পরবর্তী কারিগরি পরীক্ষা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত অনুমোদনের ওপর।
যেভাবে উৎপাদন হবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন করা হবে। সেই তাপ ব্যবহার করে তৈরি হবে বাষ্প। বাষ্পের চাপে ঘুরবে টারবাইন, আর টারবাইনের সঙ্গে সংযুক্ত জেনারেটর থেকে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক পর্যায়ে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে চুল্লির তাপমাত্রা, চাপ, শীতলীকরণব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
কারিগরি জটিলতা কাটিয়ে নতুন অগ্রগতি
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে গত সেপ্টেম্বর মাসে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় নির্ধারিত কার্যক্রম পিছিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমস্যা সমাধান এবং পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর ১১ অক্টোবর প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়। সেই ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করার পর এবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছাল প্রকল্পটি।
দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রয়েছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট। উভয় ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় নির্মিত দেশের বৃহত্তম এই একক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এনপিসিবিএল।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল দুই দফা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের প্রভাবে প্রকল্পটির টাকায় হিসাব করা ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক
রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হবে। এটি দেশের জ্বালানি খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া এবং পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন চালু হওয়া এক বিষয় নয়। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে কেন্দ্রটির বিভিন্ন ব্যবস্থা কয়েক মাস ধরে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সফলভাবে সম্পন্ন হলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
মন্তব্য করুন