লিড নিউজ ২৪ ডেস্ক | লক্ষ্মীপুর | ২৯ অক্টোবর ২০২৬:
লক্ষ্মীপুরে বাড়ির অদূরে মাটি ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ এক বর্ণনা। পরিবারের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়ার পর তাঁকে মাটিতে ফেলে দুই হাত চেপে ধরা হয়। এরপর বুকের ওপর অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পার্বতীনগর ইউনিয়নের দিলশাদপুর গ্রামে।
নিহত খোরশেদ আলম ওই গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে। তিনি স্থানীয় ইটভাটাগুলোতে মাটি সরবরাহের ব্যবসা করতেন। পরিবারের দাবি, ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে হত্যা করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাবার হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে খোরশেদের ১৯ বছর বয়সী মেয়ে প্রেমা আক্তার জানান, ঘটনার সময় তাঁর বাবা বাড়ির কাছে ডাব খাচ্ছিলেন। এ সময় তিন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হন। তাঁদের একজন লাথি মেরে বাবার হাত থেকে ডাব ফেলে দেন। এরপর তাঁকে মাটিতে শুইয়ে দুজন দুই হাত শক্ত করে ধরে রাখেন। অন্য একজন বুকের ওপর থেকে শার্ট সরিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেন।
তবে প্রেমা নিজে পুরো হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেননি। ঘটনার সময় বাবার সঙ্গে থাকা একজনসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তিনি এই বর্ণনা শুনেছেন বলে জানিয়েছেন।
প্রেমার অভিযোগ, তাঁর বাবাকে গুলি করেছেন মো. ওয়ালিদ নামের এক ব্যক্তি। মাটির ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই বিরোধ চলছিল। ওই বিরোধের জেরে খোরশেদকে বিভিন্ন সময় হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের।
এভাবে বাবাকে হারিয়ে শোকাহত প্রেমা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ক্ষতি করতে পারেন।
ঘটনাস্থল নিহত খোরশেদের বাড়ি থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে। স্থানীয় গ্রাম পুলিশ সদস্য নূর মোহাম্মদ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, সড়কের পাশে একটি বাড়ির ফটকের কাছে গুলির ঘটনা ঘটে। গুলির শব্দ তুলনামূলক কম শোনা যাওয়ায় খুব কাছ থেকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনটি গুলিসংক্রান্ত আলামত উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে দুটি গুলির খালি খোসা এবং একটি অব্যবহৃত গুলি রয়েছে।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা অরূপ পাল জানিয়েছেন, খোরশেদকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বুকে দুটি গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি ছোট এবং অন্যটি অপেক্ষাকৃত বড়।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে বুধবার রাতে লক্ষ্মীপুর সদর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় মো. ওয়ালিদ ও মো. সোহাগসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুজনকে আসামি করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন দিলশাদপুর গ্রামের ইব্রাহিম ছোট্টু (৪৪) এবং রাধাপুর গ্রামের মাসুদ রানা (২৬)।
লক্ষ্মীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াহিদ পারভেজ জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। হত্যার প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার বিস্তারিত জানতে তদন্ত চলছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, নিহত খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধেও আগে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে রোববার দিবাগত রাতে পূর্ব নন্দনপুর গ্রামের একটি সুপারিবাগান থেকে জাকির হোসেন নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। ওই হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক কারবারসংক্রান্ত বিরোধ থাকতে পারে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।
পরপর এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খোরশেদ আলমের পরিবার হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তবে পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা এখনো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়নি।
মন্তব্য করুন