উত্তরা সংবাদদাতা :
রাজধানীর উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী সংলগ্ন তুরাগ নদীর ঘাট এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার দুদিন পর তাহসিফ (৪৬) নামে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নদী থেকে তাঁর মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। আকস্মিক এই মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, অন্যদিকে পুরো এলাকায় তৈরি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য।
পেশায় একসময়ের চৌকস এই কর্মকর্তা কেন এবং কীভাবে এমন রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হলেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নিখোঁজ থাকায় এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—সে বিষয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার বিকেলে রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত নৌ পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে টঙ্গী ও উত্তরখান এলাকার দায়িত্বে থাকা নৌ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফিরোজের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এরপর স্থানীয়দের সহায়তায় নদী থেকে মরদেহটি তীরে তুলে আনা হয়। প্রাথমিক সুরতহাল (Condition report) শেষে পুলিশ জানায়, পানিতে থাকার কারণে শরীর কিছুটা ফুলে গেলেও মরদেহের গায়ে প্রাথমিকভাবে কোনো দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
মরদেহ উদ্ধারের পর নৌ পুলিশ নিহতের পকেট তল্লাশি করে একটি মানিব্যাগ ও একটি আইফোন উদ্ধার করে। ফোনটি পানিতে ভিজে বন্ধ হয়ে থাকলেও, পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ফোন থেকে সিম কার্ডটি বের করে অন্য একটি ডিভাইসে সচল করে। এরপর সেই সিমের কন্ট্যাক্ট থেকে নিহতের এক খালাতো ভাইকে কল করে মর্মান্তিক এই দুঃসংবাদটি জানানো হয়।
খবর পেয়ে শোকাহত স্বজনেরা দ্রুত রাজাবাড়ী ঘাটে ছুটে আসেন এবং মরদেহ শনাক্ত করেন। কান্নায় ভেঙে পড়া স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ছিল না উপস্থিত কারও। এ সময় সংবাদকর্মীরা নিহতের খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি কান্ন জড়িত কণ্ঠে কেবল বলেন, “এখন কথা বলার মতো কোনো পরিস্থিতি বা মানসিক অবস্থা আমার নেই। দয়া করে আমাকে এখন কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।”
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত তাহসিফ উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে কর্মরত থাকলেও প্রায় দুই বছর আগে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে পদত্যাগ করে অবসরে যান।
গত ২৭ অক্টোবর (রবিবার) রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি বাসা থেকে বের হন। এরপর থেকেই তাঁর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায় এবং পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাচ্ছিল না পরিবার। স্বজনেরা জানান, নিখোঁজ হওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে একটি মোটরসাইকেল ছিল। কিন্তু মরদেহ উদ্ধারের পর আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও সেই মোটরসাইকেলের কোনো হদিস পায়নি পুলিশ।
তদন্তের সম্ভাব্য দিক ও পুলিশের বক্তব্য
দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকায় এটি আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা নাকি শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে—তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। তবে মোটরসাইকেলটি উধাও হয়ে যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েও তিনি প্রাণ হারিয়ে থাকতে পারেন।
নৌ পুলিশের উত্তরখান থানার ওসি মো. ফিরোজ জানান, “আমরা খবর পাওয়া মাত্রই মরদেহ উদ্ধার করি। প্রাথমিক সুরতহালে আঘাতের চিহ্ন না মিললেও, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন (Autopsy report) হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। আমরা সব কটি বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছি।”
জানা গেছে, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছে:
১. কল ডাটা রেকর্ড (CDR) বিশ্লেষণ: উদ্ধারকৃত আইফোনের সিমের মাধ্যমে তাঁর সর্বশেষ কললিস্ট চেক করা হচ্ছে। নিখোঁজ হওয়ার রাতে তিনি কার কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং তাঁর সর্বশেষ লোকেশন কোথায় ছিল, তা ট্র্যাক করা হচ্ছে।
২. সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ: উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি কোন রাস্তা ব্যবহার করেছিলেন, তা জানতে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া চলছে।
৩. মোটরসাইকেলের সন্ধান: হারানো মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা গেলে এই রহস্যের বড় জট খুলবে বলে মনে করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
বুধবার সন্ধ্যায় স্বজন ও নৌ পুলিশের উপস্থিতিতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে উত্তরা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের প্রযুক্তিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমেই খুব দ্রুত এই মৃত্যু রহস্যের জট খুলবে বলে প্রত্যাশা করছেন নিহতের পরিবার ও সচেতন মহল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরখান থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, নদীর বিষয়টি নৌ পুলিশ দেখেন, তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দিতে চাইলে আমরা মামলা নিবো।
মন্তব্য করুন