সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪:
ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের পাইলট ও কেবিন ক্রু হিসেবে দায়িত্ব পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো। ইসরায়েলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সের এয়ার ফ্রান্স ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নতুন বিধিনিষেধ সম্পর্কে জানিয়েছে। একই ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড এয়ারলাইনসও।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ ছিনতাই ও হামলার চেষ্টার ঘটনার পর ইসরায়েল এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মূলত যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, সেসব দেশের নাগরিকদের দেশটিতে চলাচলকারী উড়োজাহাজে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কার্যকর করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের নির্দেশনার আওতায় অন্তত ৩১টি দেশের নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, কুয়েত, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, আলজেরিয়া ও তিউনিশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ রয়েছে।
তবে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় ২৯টি দেশের নাম পাওয়া গেছে। দুই তালিকার পার্থক্যের বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
নতুন বিধিনিষেধ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকত্ব রয়েছে এমন কোনো পাইলট বা কেবিন ক্রু ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কর্মীদের ক্ষেত্রেও এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হতে পারে।
ফ্রান্সের জাতীয় বিমান সংস্থা এয়ার ফ্রান্স জানিয়েছে, যেসব দেশে তারা ফ্লাইট পরিচালনা করে, সেসব দেশের প্রবেশসংক্রান্ত বিধিবিধান মেনে চলা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। এ কারণে ইসরায়েলের নতুন নির্দেশনার আওতায় পড়া কর্মীদের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্বধারী কর্মীদের ইসরায়েলগামী ফ্লাইটের দায়িত্ব পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
এ ছাড়া চেক প্রজাতন্ত্রের বিমান সংস্থা স্মার্টউইংসও ইসরায়েলের নির্দেশনা মেনে চলার কথা জানিয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এখন পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ তাদের ফ্লাইট পরিচালনা কিংবা কর্মী ব্যবস্থাপনায় কোনো প্রভাব ফেলেনি।
ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজে কী ঘটেছিল
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ। সৌদি আরবের আকাশসীমায় প্রবেশের পর উড়োজাহাজটির ওমানি সহকারী পাইলট হামাম আল-হাম্মামি ককপিটে থাকা ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহকারী পাইলট জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য ককপিটে রাখা একটি কুঠার দিয়ে ক্যাপ্টেনকে আঘাত করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে আঘাত হানা।
হামলার সময় উড়োজাহাজটি মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়। এতে যাত্রী ও ক্রুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আহত ক্যাপ্টেন এবং উড়োজাহাজে থাকা অন্য দুই পাইলটের প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।
এই ঘটনায় সহকারী পাইলটকে আটক করা হয়। তদন্তে তাঁর পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে আমিরাত কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর পাইলট ও কেবিন ক্রুদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিষয়টি আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়।
ইন্দোনেশীয় পাইলট থাকায় ফিরিয়ে দেওয়া হলো উড়োজাহাজ
নতুন বিধিনিষেধের প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে পড়তে শুরু করেছে।
সম্প্রতি ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রা করার পর মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটির একজন পাইলট ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক ছিলেন। দেশটির সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় ওই পাইলটকে নিয়ে উড়োজাহাজটি ইসরায়েলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে যাত্রা করার প্রায় এক ঘণ্টা পর উড়োজাহাজটিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে পাইলট পরিবর্তন করে উড়োজাহাজটি পুনরায় তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করে।
নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ
এদিকে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কর্মীদের জাতীয়তার ভিত্তিতে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ সীমিত করা বৈষম্যমূলক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ফ্রান্সের কয়েকজন আইন বিশেষজ্ঞের মতে, কোনো কর্মীর দক্ষতা বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্যক্তিগত ঝুঁকি যাচাই না করে শুধু তাঁর নাগরিকত্বের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া দেশটির শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একজন ব্যক্তির নাগরিকত্বকে একমাত্র বিবেচনায় নিয়ে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব সীমিত করার সিদ্ধান্ত আইনগত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে এয়ার ফ্রান্সের অবস্থান হলো, সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রবেশসংক্রান্ত নিয়ম মেনে বিমান পরিচালনা করা তাদের দায়িত্ব।
বাংলাদেশি পাইলটদের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকায় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থায় কর্মরত বাংলাদেশি পাইলট ও কেবিন ক্রুদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশি বিমান সংস্থায় কর্মরত এবং ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান, তাঁদের দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে এই বিধিনিষেধের অর্থ আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইটে বাংলাদেশি পাইলটদের নিষিদ্ধ করা নয়। এটি মূলত ইসরায়েলগামী এবং সংশ্লিষ্ট আকাশসীমায় পরিচালিত নির্দিষ্ট ফ্লাইটের ক্রুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এখন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে কতজন বাংলাদেশি পাইলট বা কেবিন ক্রু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কঠোরতা এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর নতুন সিদ্ধান্ত বিমান চলাচল খাতে নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক ও কর্মীদের অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মন্তব্য করুন