সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের আটক করে মারধর ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ অমানবিক আচরণ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, পুলিশের মারধরে এক বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী একটি কানের শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। এ ছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও উঠেছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে নির্যাতনের শিকার বলে দাবি করা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রাহুল গান্ধী। সেখানে তিনি দিল্লি পুলিশের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আথিরা। ভারতের কেরালা রাজ্য থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে আসা এই শিক্ষার্থী মঙ্গলবারের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
আথিরার অভিযোগ, আন্দোলন চলাকালে পুলিশ তাঁকে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আটক করে একটি বাসে তোলে। কিন্তু বাসে কোনো নারী পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে পুলিশ সদস্যরা ক্ষুব্ধ হন। পরে কনট প্লেস থানার সামনে বাস থামিয়ে তাঁকে মারধর করা হয়।
তিনি জানান, ওই সময় তাঁর গাল ও কানে একাধিকবার চড় মারা হয়। এতে কানে গুরুতর আঘাত পান এবং একটি কানে শুনতে অসুবিধা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
শিক্ষার্থীর বক্তব্য তুলে ধরে রাহুল গান্ধী বলেন, কেরালার এই ছাত্রী এখন একটি কানে শুনতে পাচ্ছেন না। পুলিশের আঘাতে তাঁর এমন অবস্থা হয়েছে। এর আগেও পুলিশের নির্যাতনে এক তরুণের দৃষ্টিশক্তি হারানোর অভিযোগ সামনে এসেছিল।
সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার (এনএসইউআই) আরেক কর্মী ঋতু বারালাও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁর অভিযোগ, আটক করার পর এক নারী পুলিশ সদস্য তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বাসের আসনে ফেলে দেন। পরে মুখে আঁচড় দেওয়ার পাশাপাশি বারবার চড় মারেন। থানায় নেওয়ার পরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁদের মারধর করেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় চঞ্চল যাদব নামের এক নারী পুলিশ কনস্টেবলের বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিলে আরও কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের একজন জানান, থানার একটি কক্ষে নিয়ে তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এতে কয়েকজনের হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়েছে। এমনকি অন্য এক নারী শিক্ষার্থীর স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে নির্যাতনের অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, ভয়ভীতি কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদ থামানো যাবে না। সহিংসতার জবাব শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই দেওয়া হবে।
এদিকে মঙ্গলবার রাজধানীর রাজীব চক মেট্রোস্টেশন এলাকায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে এনএসইউআই। সংগঠনটির জাতীয় সভাপতি বিনোদ জাখরের নেতৃত্বে আয়োজিত কর্মসূচিতে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে পরে কনট প্লেস থানার সামনেও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম (এসআইআর) ঘিরে কয়েক দিন ধরেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। এ অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিতর্কিত সংশোধন কার্যক্রম বাতিলের দাবি জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠন।
কংগ্রেসের পাশাপাশি অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং তরুণদের বিভিন্ন সংগঠনও আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি দিল্লির যন্তর মন্তরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া কয়েকজন সাংবাদিক ও আইনজীবীকেও আটকের অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের দাবি, তালিকা সংশোধন একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
এর আগে আন্দোলন ঘিরে আটক কয়েকজন ব্যক্তি পুলিশের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক আঘাতের তথ্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতেও উঠে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের আনা নির্দিষ্ট অভিযোগগুলো সম্পর্কে দিল্লি পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আথিরার শ্রবণশক্তি হারানোর দাবির পক্ষেও স্বাধীন চিকিৎসা-সংক্রান্ত নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে চলমান আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর কথিত পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে দেশটিতে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
মন্তব্য করুন