সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
ঢাকা | বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আল-নূর মোহাম্মদ আয়াসসহ দুই আসামির জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতকক্ষে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে বিচারক সাময়িকভাবে এজলাস ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এ ঘটনা ঘটে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে বিচারক পুনরায় এজলাসে ফিরে আসেন এবং আয়াস ও অপর আসামি মারজিয়া খন্দকার রিমিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তিন দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার আয়াস ও মারজিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক আব্দুল গাফফার হিমেল তাঁদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানান। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দাখিল করা আবেদনে উল্লেখ করেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পলাতক অন্য আসামিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। তদন্তের স্বার্থে এবং আসামিদের পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে রাখা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসেন দাবি করেন, তাঁর মক্কেলদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আইনগত ভিত্তি নেই। আয়াস অসুস্থ এবং মারজিয়ার একটি শিশু সন্তান রয়েছে। মানবিক ও আইনগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের জামিন দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে আঁকা প্রতিকৃতি ঘিরে তাঁদের প্রতিবাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধিতা করা। দেশের শিল্পী ও সংস্কৃতির প্রতি সমর্থন জানাতেই তাঁরা নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী আসামিপক্ষের এসব যুক্তির বিরোধিতা করেন। তাঁর অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড কেবল প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সামাজিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুনানির একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আসামিদের রাজনৈতিক অবস্থান ও তাঁদের সমর্থনে আদালতে উপস্থিত আইনজীবীদের পরিচয় নিয়ে মন্তব্য করেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলাকে কেন্দ্র করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান।
এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হয় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়। একপর্যায়ে বিচারকের সামনেই কয়েকজন আইনজীবী হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদের শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আদালতকক্ষে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসেন পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নেন।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর, বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে বিচারক পুনরায় এজলাসে ফিরে আসেন। এরপর শুনানি-পরবর্তী আদেশে আয়াস ও মারজিয়াকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় আল-নূর মোহাম্মদ আয়াসসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে মামলা করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পরদিন আদালত আয়াসসহ দুজনের তিন দিন এবং অপর দুজনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে জামিন শুনানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে আদালতকক্ষেই আইনজীবীদের হাতাহাতির ঘটনায় বিচারিক পরিবেশ ও আদালতের শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। মতবিরোধ ও পাল্টাপাল্টি যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ থাকলেও আদালতে পেশাগত শালীনতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তবে মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
মন্তব্য করুন