স্পোর্টস ডেস্ক | লিড নিউজ ২৪:
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস গড়লেন তরুণ পেসার হাসান মাহমুদ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে দেশের প্রথম পেসার হিসেবে অনন্য এক কীর্তির মালিক হয়েছেন তিনি। শুধু হ্যাটট্রিকেই থেমে থাকেননি, তুলে নিয়েছেন পাঁচ উইকেটও। স্মরণীয় এই অর্জনের পর নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে হাসান জানিয়েছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করতে পারার ফলেই এসেছে এমন সাফল্য।
রোববার (১১ অক্টোবর) সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের তৃতীয় দিনে এই কীর্তি গড়েন বাংলাদেশের ডানহাতি পেসার। তাঁর বিধ্বংসী বোলিংয়ে আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ২৪০ রানে। প্রথম ইনিংসে ৩৪৬ রান করা বাংলাদেশ পায় ১০৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড।
দিনের শুরুতে আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপ তৈরি করেন বাংলাদেশের পেসাররা। তবে ম্যাচের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেন হাসান। নিজের দিনের দ্বিতীয় ওভারে টানা তিন বলে তিন উইকেট তুলে নিয়ে আফগান ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান তিনি।
হ্যাটট্রিকের প্রথম শিকার হন ইসমত আলম। হাসানের দুর্দান্ত ডেলিভারি ব্যাট ফাঁকি দিয়ে সরাসরি আঘাত হানে অফ স্টাম্পে। পরের বলেই কায়েস আহমদকে ফেরান তিনি। ব্যাটের কানায় লেগে আসা বল ডান দিকে ঝাঁপিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় তালুবন্দি করেন উইকেটরক্ষক লিটন দাস।
তৃতীয় বলেই তৈরি হয় ইতিহাস গড়ার সুযোগ। জিয়াউর রহমানের প্যাডে বল লাগলে জোরালো আবেদন করেন হাসান। তবে মাঠের আম্পায়ার আবেদনে সাড়া দেননি। এরপর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও উইকেটরক্ষক লিটন দাসের পরামর্শে রিভিউ নেয় বাংলাদেশ। টেলিভিশন রিপ্লেতে বল স্টাম্পে আঘাত করত বলে নিশ্চিত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত বদলে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে মেতে ওঠেন হাসানসহ বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।
এই হ্যাটট্রিকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম পেসার হিসেবে কীর্তিটি গড়েন হাসান মাহমুদ। এর আগে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে হ্যাটট্রিক করেছিলেন দুজন স্পিনার। ২০০৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অলক কাপালি এবং ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সোহাগ গাজী এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। প্রায় ১৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের তৃতীয় বোলার হিসেবে সেই তালিকায় নাম লেখালেন হাসান।
ঐতিহাসিক সাফল্যের পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে হাসান বলেন, অনুভূতিটা তাঁর কাছে অসাধারণ। উইকেট থেকে বলের মুভমেন্ট পাওয়ার পর তিনি চেষ্টা করেছেন সঠিক জায়গায় বল ফেলতে এবং সুইং কাজে লাগাতে। নিজের স্বাভাবিক বোলিং পরিকল্পনায় আস্থা রেখেই সফল হয়েছেন বলে জানান এই পেসার।
আগের দিন মাত্র একটি উইকেট পেলেও আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি ছিল না হাসানের। তাঁর ভাষায়, আগের দিন একটি উইকেট পাওয়ার পরও তিনি মোটেও দুশ্চিন্তায় ছিলেন না। বরং পরদিন নতুন করে সুযোগ কাজে লাগানোর অপেক্ষায় ছিলেন। সকালে উইকেট থেকে বাড়তি সুবিধা পাওয়ায় নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হয়েছে।
হ্যাটট্রিকের শেষ উইকেটটি পাওয়ার ক্ষেত্রে লিটন দাস ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন হাসান। তিনি জানান, কায়েস আহমদকে ফেরাতে লিটনের দুর্দান্ত ক্যাচ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর জিয়াউর রহমানের বিপক্ষে এলবিডব্লিউর আবেদন নাকচ হওয়ার পর রিভিউ নেওয়ার সিদ্ধান্তেও লিটন ও শান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশ এর আগে কয়েকটি রিভিউ হারানোয় নতুন করে ডিআরএস নেওয়ার বিষয়ে কিছুটা সংশয় ছিল। তবে লিটন ও শান্ত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিশ্চিত হন, বলটি স্টাম্পে আঘাত করতে পারে। তাঁদের আত্মবিশ্বাসের কারণেই শেষ পর্যন্ত রিভিউ নেওয়া হয়। আর সেই সিদ্ধান্তই এনে দেয় হাসানের ক্যারিয়ারের স্মরণীয় হ্যাটট্রিক।
অসাধারণ এই বোলিংয়ের পেছনে বিশেষ কোনো কৌশলের চেয়ে ধারাবাহিকভাবে সঠিক লাইন ও লেংথে বল করাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন হাসান। তিনি জানান, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল স্টাম্প বরাবর বল রাখা এবং কন্ডিশনের সুবিধা কাজে লাগানো। অযথা বাড়তি কিছু করার পরিবর্তে নিজের সহজ পরিকল্পনা অনুসরণ করেছেন তিনি।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ২১ ওভার বল করে মাত্র ৫৫ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট তুলে নেন হাসান। তাঁর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স বাংলাদেশের পেস আক্রমণের সামর্থ্যকে নতুন করে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে বিদেশের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের বোলারদের কার্যকারিতার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল এই অর্জন।
হ্যাটট্রিকের আনন্দের পাশাপাশি দলের সাফল্যেও বড় অবদান রেখেছেন ২৬ বছর বয়সী এই পেসার। আফগানিস্তানকে অল্প রানে আটকে দিয়ে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত অর্জনের এই বিশেষ মুহূর্ত এখন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অংশ।
মন্তব্য করুন