সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪:
রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬:
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। জননিরাপত্তার অজুহাতে সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি, গণপরিবহন বন্ধ এবং ইন্টারনেট সেবা বিঘ্নিত করার মতো পদক্ষেপের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশকে সতর্ক করেছেন সর্বোচ্চ আদালত।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিশেষ শুনানিতে আদালত নির্দেশ দেন, রাজধানীতে স্বাভাবিক জনজীবন নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তার প্রয়োজনে মেট্রোরেল ও ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও পুরো পরিবহনব্যবস্থা অচল করে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড অপসারণ, ইন্টারনেট সেবা সচল রাখা এবং নাগরিকদের নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানা গেছে, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় ‘যন্তর মন্তর ২.০’ নামে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং কয়েকটি রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আগের রাত থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে দিল্লি পুলিশ।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড স্থাপন, একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পাশাপাশি যন্তর মন্তরসংলগ্ন এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবাও বিঘ্নিত হয়। এতে রাজধানীর স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
পুলিশের এসব পদক্ষেপের বৈধতা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন আবেদনকারীরা। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় ছুটির দিন রোববারও বিশেষ শুনানির আয়োজন করেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুনানিতে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করা গ্রহণযোগ্য নয়। নাগরিকদের চলাচলের অধিকার এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যুক্তিসংগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
শুনানিতে আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী কপিল সিব্বল অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সাংবিধানিক অধিকার থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীদের নির্ধারিত কর্মসূচিস্থলে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া হয়েছে। অনেককে জোর করে পুলিশের গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়েছে এবং বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, সংশ্লিষ্ট বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য পুলিশের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত স্পষ্ট করেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের অংশ হলেও তা অবশ্যই আইন মেনে পরিচালিত হতে হবে। একইভাবে জনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে যেকোনো বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রেও সাংবিধানিক ও আইনগত সীমারেখা অনুসরণ করতে হবে।
আদালত আরও জানান, কেবল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে কাউকে আটক করা যাবে না। পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক এবং পরিচয়পত্র ছাড়া দায়িত্ব পালনের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে হবে।
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট ও আশপাশের এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা কার্যকরের বিষয়ে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতিরা। আদালত চত্বরে এ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার নির্দেশনাসংবলিত বোর্ড থাকলে তা সরিয়ে ফেলা এবং বিচারপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আদালতে প্রবেশে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগে শুক্রবারের শুনানিতেও সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে গণপরিবহনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলেও সাধারণ মানুষকে সম্পূর্ণভাবে পরিবহনসেবা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। বিশেষ করে যেসব নাগরিক ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে মেট্রোরেল, ট্রেন ও অন্যান্য গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে শনিবারের বিক্ষোভকে ঘিরে আদালতের আগের পর্যবেক্ষণ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে নতুন করে অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই রোববার বিশেষ শুনানিতে আরও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন বিচারপতিরা।
এদিকে পুরো ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। আগামী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই শুনানিতে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার নামে নাগরিক চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা হবে।
দিল্লির এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে জননিরাপত্তা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। আদালতের সর্বশেষ নির্দেশনার মূল বার্তা হলো, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
মন্তব্য করুন