সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। আন্দোলন ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। এরই মধ্যে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ হাজারো বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে সমাবেশের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানোর পাশাপাশি ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লিতে ২৫ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি স্থাপন এবং যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হয়। বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার পাশাপাশি ট্রেন চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
বিক্ষোভের অন্যতম সংগঠক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই পুলিশের হাতে আটক হন। একই সময়ে সংগঠনটির নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকেও আটক করা হয়।
আটকের আগে এক ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দীপকে জানান, গ্রেপ্তার কিংবা কারাবরণের ভয় দেখিয়ে তাঁদের আন্দোলন থামানো যাবে না। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শুধু সিজেপির নেতাকর্মীরাই নন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিসহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের পরিচিত ব্যক্তিকেও আটক করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে বহু বৈধ ভোটার নিজেদের ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটাররা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটির দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। বিরোধীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টিকে বিতর্কিত করে তুলছে বলেও অভিযোগ তাদের।
নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে চলমান বিতর্ক ইতোমধ্যে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাব চেয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশের ব্যাপক অভিযান ও ধরপাকড়ের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করতে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তি তুলে ধরেছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না করাসহ নিরাপত্তাসংক্রান্ত কারণেই বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এর আগে গত জুলাইয়ে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ককরোচ আন্দোলন ভারতের শিক্ষা খাতের অনিয়মের অভিযোগে বড় ধরনের প্রতিবাদ সংগঠিত করেছিল। সেই আন্দোলনের পর দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছিল।
এবার ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজপথে সক্রিয় হয়েছে সংগঠনটি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তরুণদের ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ভারতের রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গণআটকের পরও আন্দোলনকারীদের একাংশ দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে চলমান বিরোধ আগামী দিনগুলোতে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
মন্তব্য করুন