সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছে ফেলার চেষ্টার অভিযোগে আ ন ম আয়াসকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে তাঁকে আটক করা হয়। একই ঘটনায় আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে তাঁদের ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে নেওয়া হয়।
আয়াসের আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মসূচি, রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় সংঘর্ষ, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এর আগেও একাধিকবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করছিলেন আয়াস। খবর পেয়ে শাহবাগ থানা-পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাঁকে আটক করে।
এর আগে গত ৫ অক্টোবর শিল্পকলা একাডেমির সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। পরে ওই এলাকার দেয়ালে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়সহ ১০ জন গুণী ব্যক্তিত্বের ছবি স্থান পায়।
আ ন ম আয়াস একসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে সক্রিয় হন।
গত ৪ আগস্ট রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় নতুন ধারা বাংলাদেশ এবং রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আলোচনায় আসেন আয়াস। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে নতুন ধারা বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান শান্তা ফারজানাকে চড় মারার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষের সময় আয়াস নিজেও মারধরের শিকার হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁকে আঘাত করার দৃশ্য দেখা যায়। অন্যদিকে পাল্টা আঘাতের অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ঘটনার পর আহত ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এরপর ১৫ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে দেওয়া বাড়ির সামনে আয়াসের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তির অবস্থান নেওয়ার ঘটনা আলোচনার জন্ম দেয়। সেখানে কয়েকজনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।
ওই ঘটনায় আয়াস দাবি করেছিলেন, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সম্ভাব্য অপতৎপরতা ঠেকাতে তাঁরা সেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেছিলেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
রাজধানীর বাইরেও একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন আয়াস। ২০২৫ সালের ২৬ মে ময়মনসিংহ নগরের পাটগুদাম ব্রিজ এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় তিনি আহত হন। সে সময় তাঁকে মারধরের পাশাপাশি ছুরিকাঘাত করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি।
এ ছাড়া গত ১৬ আগস্ট ময়মনসিংহের ভালুকায় সংগঠনের কাজে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন আয়াস। তাঁর দাবি ছিল, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী তাঁকে মারধর করেন এবং একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা চালান। ঘটনার পর তাঁর নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও পরে তিনি নিজেই ভালুকা মডেল থানায় উপস্থিত হয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগেও আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন আয়াস। গত ৩ জুলাই অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি এবং নতুন ধারা বাংলাদেশের শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি ও তাঁর সংগঠনের আরও দুই ব্যক্তি। পরে বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশের সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়।
সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর মাগুরায় জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের বাড়ির সামনে আয়াসের একটি কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সমালোচনা তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, সাকিবের বাড়ির ফটকের সামনে প্রস্রাব করার একটি ভিডিও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর আচরণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা, সংঘর্ষের ঘটনা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বারবার আলোচনায় আসা আয়াস এবার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি মুছে ফেলার অভিযোগে পুলিশের হাতে আটক হলেন।
তবে শনিবারের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কি না কিংবা আটকের পর পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে শিল্পকলা একাডেমির সামনে গ্রাফিতি মুছে ফেলার চেষ্টার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল এবং এ ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা পুলিশের পরবর্তী তদন্তে স্পষ্ট হতে পারে।
মন্তব্য করুন