
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরী হত্যা মামলার অন্যতম আলোচিত আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের রিমান্ড শুনানিতে সাংবাদিকদের উপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আদালতের বিচারক। একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকদের এজলাসকক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় আদালতপাড়ার সাংবাদিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাতের আদালতে এ ঘটনা ঘটে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দীপের দ্বিতীয় দফার রিমান্ড আবেদনের শুনানি শুরুর আগে এজলাসে উপস্থিত সাংবাদিকদের দেখে বিচারক তাঁদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছ থেকে সাংবাদিকেরা প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারবেন। এ সময় পুলিশকে এজলাসকক্ষ খালি করার নির্দেশও দেন তিনি।
পরে সাংবাদিকেরা এজলাসের পেছনের দিকে অবস্থান নিলে শুনানি শুরু হয়।
বিচারকের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন কোর্ট রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মামুন খান। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে আদালতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মামলার শুনানি কাভার করলেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি তাঁদের।
তিনি অভিযোগ করেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্যের পর বিচারক সাংবাদিকদের বেরিয়ে যেতে বলেন। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব ও সাবেক জেলা জজ শাহজাহান সাজু মনে করেন, উন্মুক্ত আদালতের শুনানিতে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের উপস্থিত থাকার সুযোগ রয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এ ধরনের শুনানি থেকে সাংবাদিকদের বেরিয়ে যেতে বলা যথাযথ হয়নি।
দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড
এদিকে তাহসিফ হত্যা মামলায় দীপকে দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর আগে তাঁকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ উদ্দিন পুনরায় রিমান্ডের আবেদন করেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রথম দফার জিজ্ঞাসাবাদে দীপের কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সেসব তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় আসামি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন। এ কারণে তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন শুনানিতে বলেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ ও কথোপকথন বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কিংবা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা দরকার বলে তিনি যুক্তি দেন। তবে এ ধরনের কোনো সম্পৃক্ততা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ পুনরায় রিমান্ডের বিরোধিতা করেন। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্রপক্ষ আসামির কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করছে। প্রথম দফার চার দিনের রিমান্ডের পর আবার সাত দিনের রিমান্ড চাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত দীপের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
যেভাবে নিখোঁজ হন তাহসিফ
মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরী। এরপর তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
এ ঘটনায় ৩০ অক্টোবর রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্তে দীপকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইতিমধ্যে দুই দফায় তাঁর মোট সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
লিড নিউজ ২৪ | সত্য প্রকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ
মন্তব্য করুন