ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর মিরপুর ও গাজীপুরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছে পুলিশ। রোববার (১ নভেম্বর) দুই এলাকায় মোট ৪৯ জনকে আটক ও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন পুলিশ সূত্রের দেওয়া তথ্যে আটক-গ্রেপ্তারের মোট সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।
পুলিশের অভিযোগ, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মিশে পুলিশের গাড়িতে আগুন, সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
রাজধানীর মিরপুরে রোববার সকাল থেকে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বর এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে।
সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৯ জনকে আটকের তথ্য জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং আটজনকে থানা-পুলিশ আটক করেছে বলে জানানো হয়।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান অভিযোগ করেছেন, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল। তাঁদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত হন।
পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিদের কয়েকজন রাজনৈতিক সংগঠনের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যাঁরা স্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিক নন। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নিয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চলাকালে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ঘটে। কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
গাজীপুরে আন্দোলনে উসকানি, সহিংসতা এবং অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নয় নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার ভোরে কালিয়াকৈরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কালিয়াকৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ সিকদার, মৌচাক ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আরিফুল হোসেন এবং স্থানীয় কৃষক লীগ নেতা মাসুম মিয়া। এ ছাড়া যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সহিংস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগেই এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আন্দোলন ঘিরে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্প পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পোশাকশ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত দাবি বিবেচনায় সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এরপরও বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায় আন্দোলনকে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, শিল্পকারখানার সুরক্ষা এবং স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর দাবি করেছে পুলিশ।
তবে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি এবং আন্দোলনের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতার অভিযোগকে পৃথকভাবে বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আটক ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
মন্তব্য করুন