২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্র ১৪ দলীয় জোটকে ‘অপরাধমূলক সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে এ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চার নেতার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে হানিফকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন। বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
পরিকল্পিত হামলার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। বরং একটি অভিন্ন নিপীড়নমূলক নীতি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সংগঠিতভাবে এসব হামলা পরিচালিত হয়েছিল।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং রাজনৈতিক মিত্র ১৪ দলীয় জোট ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রেখেছিল।
এসব কর্মকাণ্ডকে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে, দণ্ডপ্রাপ্ত চার নেতা সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে জেনেশুনে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
হানিফের মৃত্যুদণ্ড, তিন নেতার আমৃত্যু কারাদণ্ড
কুষ্টিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দেওয়া রায়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার চার আসামিই বর্তমানে পলাতক। তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করা হয়।
হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র, উসকানি, অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁদের দায় প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
দণ্ডিতদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ
কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি চার আসামির স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা আইনগতভাবে নির্ধারিত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণের কথা বলা হয়েছে।
অভিন্ন অপরাধমূলক উদ্দেশ্যের বিষয়টি প্রমাণিত: প্রসিকিউশন
রায় ঘোষণার পর মামলার প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম সাংবাদিকদের জানান, মামলায় ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ বা অভিন্ন অপরাধমূলক উদ্দেশ্যের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে সংঘটিত ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিকল্পনার অংশ ছিল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং ১৪ দলীয় জোট সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে অভিযোগ উপস্থাপন করে।
প্রসিকিউটর জানান, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চার আসামিকেই ওই অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোকে অপরাধমূলক সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণ ও সংগঠন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত এক নয়
এ মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া পর্যবেক্ষণ মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা এবং দণ্ডিত ব্যক্তিদের অপরাধমূলক দায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে কোনো সংগঠনকে রায়ের পর্যবেক্ষণে অপরাধমূলক হিসেবে চিহ্নিত করা এবং পৃথক আইনি প্রক্রিয়ায় সেই সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। আলোচিত এই রায়টি চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেওয়া হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতার বিচারপ্রক্রিয়ায় এই পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এর মাধ্যমে কেবল ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নয়, সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধের সম্পর্কও আদালতের বিবেচনায় উঠে এসেছে।
মন্তব্য করুন