সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪:
সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কার একটি মসজিদে কথিত ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে বাংলাদেশি এক নারী ও এক পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার কিংবা জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি বলে জানা গেছে। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সৌদি সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তাঁদের নাম ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কর্মকর্তাদের বরাতে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আগাম কোনো তথ্য দেয়নি। গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়। এতে দুই নাগরিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে।
সৌদিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আজেল এবং ওকাজে প্রকাশিত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে নিরাপত্তা বাহিনী। পরবর্তী সময়ে তদন্তের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং মামলাটি সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়।
আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন। অপরাধের গুরুত্ব এবং পবিত্র স্থান ও সময়ের মর্যাদা লঙ্ঘনের বিষয় বিবেচনা করে ইসলামি আইনের ‘তাআজির’ বিধানের আওতায় তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাআজির হলো শরিয়াহ আইনে বিচারিক বিবেচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত শাস্তির একটি ব্যবস্থা।
সংশ্লিষ্ট উচ্চতর কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়ে রাজকীয় আদেশ জারি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে ওই দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
তবে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযুক্ত দুজন ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, কোন মসজিদে ঘটনাটি ঘটেছিল কিংবা কখন তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁরা আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়েও প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে অবহিত না করার বিষয়টি কনস্যুলার যোগাযোগ ও নাগরিকদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁকে নিজ দেশের কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার সম্পর্কে জানাতে হয়। আটক ব্যক্তি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে অবহিত করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই এ সনদের পক্ষভুক্ত।
তবে সংশ্লিষ্ট দুই বাংলাদেশি তাঁদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে জানানোর অনুরোধ করেছিলেন কি না কিংবা তাঁদের কনস্যুলার সহায়তা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দা কনস্যুলেটের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দুই নাগরিকের সৌদি আরবে অবস্থানের মেয়াদ, গ্রেপ্তারের সময়, মামলার বিচারিক কার্যক্রম এবং তাঁদের পক্ষে আইনি সহায়তার ব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের আগে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দেশের কূটনৈতিক মিশনের অবগত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়া চললেও বাংলাদেশ কনস্যুলেট কেন বিষয়টি জানতে পারেনি, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির পবিত্র মসজিদগুলোর মর্যাদা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার কার্যকরের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘন ও অনৈতিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলেও বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে।
এখন দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে আগাম অবহিত না করার কারণ জানা।
সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং কনস্যুলার সহায়তার বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হতে পারে।
মন্তব্য করুন