সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও প্রবৃদ্ধির অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলতি বছরের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের যৌথভাবে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের নাম ঘোষণা করে। এমন এক সময়ে এ ঘোষণা এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের কারণে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
নোবেল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক আচরণের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য হল ও উডফোর্ডকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের গবেষণা অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারগুলোর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করেছে।
রবার্ট ই. হল যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ। অন্যদিকে মাইকেল উডফোর্ড নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মুদ্রানীতি এবং বাজারে ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আচরণ নিয়ে গবেষণা করে আসছেন।
অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে নতুন কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এই দুই গবেষক। তাঁদের কাজের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ‘নিউ কেইনসিয়ান’ অর্থনৈতিক মডেল বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষ করে মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহারসংক্রান্ত ভবিষ্যৎ নীতির আগাম নির্দেশনা বা ‘ফরওয়ার্ড গাইডেন্স’ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু সুদের হার পরিবর্তন করেই নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতি সম্পর্কে জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করেও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
পুরস্কার ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় মাইকেল উডফোর্ড জানান, এমন সম্মাননা পাওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের। এ স্বীকৃতি তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও দীর্ঘদিনের গবেষণার আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে তিনি উচ্ছ্বসিত।
এ বছর অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীদের জন্য মোট এক কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা অর্থমূল্যের পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে নোবেল ঘোষণার দিনেই যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগের তথ্য সামনে এসেছে। দেশটির হিসাবরক্ষণ ও ব্যবসায়িক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিডিও জানিয়েছে, জ্বালানি, পরিবহন ও কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্রিটিশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়িক মূল্যস্ফীতি সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৩ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে। আগস্টে সূচকটি ছিল ১০২ দশমিক ১৮ পয়েন্ট। এটি ২০২৩ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ অবস্থান।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ায় যুক্তরাজ্যের উৎপাদন ও সেবা খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি ঋণের ব্যয়ও বাড়ছে। এতে শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, সরকারের আর্থিক পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ফিসক্যাল স্টাডিজ (আইএফএস) সতর্ক করে জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় দেশটির বাজেটে প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি পাউন্ডের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
আগামী ২৮ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের বাজেট ঘোষণার কথা রয়েছে। এর আগে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সরকারি ব্যয়ের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি করা না হলে বাজেটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার মান ধরে রাখতে সরকারকে কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী দুই গবেষকের কাজ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় শুধু সুদের হার কিংবা সরকারি ব্যয় পরিবর্তন নয়, বরং সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত কীভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে তাঁদের গবেষণা।
অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে এসব ধারণার গুরুত্ব বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রেও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সময়োপযোগী মুদ্রানীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
মন্তব্য করুন