সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪:
লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে একটি মাদ্রাসার শিশুশিক্ষার্থীদের পায়ে শিকল বেঁধে রাখা ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নির্যাতনের একাধিক ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে রামগতি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত আলেকজান্ডার মাদ্রাসায়ে বাবুত তাকওয়া নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। গত বছর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাটিতে বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, অল্পবয়সী দুই শিশুর পায়ে শিকল বাঁধা। তাদের একজন কান্নারত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। অন্য শিশুটিকে শিকল বাঁধা অবস্থায় পবিত্র কোরআন পড়তে দেখা যায়। শিশুদের এমন অসহায় অবস্থার ছবি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু শিকল দিয়ে বেঁধে রাখাই নয়, প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা একাধিক ভিডিওতে শিশুদের মারধরের দৃশ্যও উঠে এসেছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কক্ষের দরজা বন্ধ করে এক শিশুকে বারবার চড়-থাপ্পড় মারছেন একজন শিক্ষক। একপর্যায়ে শিশুটির মাথায় আঘাত করার পাশাপাশি স্টিলের স্কেল দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয়।
আরেকটি ভিডিওতে এক শিক্ষার্থীকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে মাথায় আঘাত করতে দেখা যায়। পৃথক ভিডিওতে কয়েকজন শিশুকে একসঙ্গে মারধরের দৃশ্যও রয়েছে। এসব ঘটনায় মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কঠোর ও অমানবিক আচরণ করা হচ্ছিল। শিক্ষকদের ভয়ে অনেক শিশু বাড়িতে ফিরে নির্যাতনের বিষয়ে অভিভাবকদের কিছু জানাত না। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে সামনে আসে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা হাবিব উল্লাহ নীরব। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রামগতি পৌরসভা শাখার সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন।
নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসার পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক হাবিব উল্লাহ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও অন্য একজন শিক্ষককে দায়ী করে নিজে মারধরে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযুক্ত একজন শিক্ষককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।
এদিকে, রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দীন জানিয়েছেন, শিশু নির্যাতনের ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে এসেছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন দেওয়ান ঘটনাটিকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে অভিভাবকদের আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের পক্ষ থেকে মামলা করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সভাপতি কামাল হোসেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শিকলে বেঁধে রাখার ঘটনাকে অমানবিক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ঘটনার যথাযথ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা ও তদারকিব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই হবে না, ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থী যেন এমন নির্যাতনের শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব। অথচ লক্ষ্মীপুরের এই ঘটনায় শিক্ষার পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং শিশুশিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের
মন্তব্য করুন