সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
বনাঞ্চলের বুক চিরে তৈরি মহাসড়ক মানুষের যোগাযোগব্যবস্থাকে সহজ করলেও বন্যপ্রাণীর জন্য হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কায় প্রতিবছর অসংখ্য প্রাণী মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি সড়কের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। এই সংকট মোকাবিলায় অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। আমাজন বনাঞ্চলের সড়কের ওপর দড়ি ও জাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ঝুলন্ত সেতু, যা ব্যবহার করে নিরাপদে চলাচল করছে বানরসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী।
ব্রাজিলের মাতো গ্রোসো রাজ্যের আলতা ফ্লোরেস্তা শহরের কাছে ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে আটটি ঝুলন্ত সেতু স্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির ফলাফল পরিবেশবিদদের আশাবাদী করে তুলেছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মাত্র ১৫ মাসে এসব সেতু ব্যবহার করে প্রায় ১৫ হাজারবার নিরাপদে সড়ক পার হয়েছে বিভিন্ন প্রাণী। একই সময়ে প্রকল্পের আওতাধীন সড়ক এলাকায় কোনো প্রাণীর গাড়িচাপায় মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
প্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক প্রকল্প ‘প্রোজেতো রিকনেক্টা’র আওতায় বিশেষ এই সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির নেতৃত্বে রয়েছেন ব্রাজিলীয় জীববিজ্ঞানী ফার্নান্দা আব্রা। যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু অ্যান্ড কনজারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউটের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের ফলে অনেক প্রাণী নিজেদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে গাছে বসবাসকারী বানর ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য এক বন থেকে অন্য বনে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ খাবারের সন্ধানে রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে, আবার কেউ সড়কের কারণে দীর্ঘদিন একই এলাকায় আটকে থাকে।
এই সমস্যার সমাধানে সড়কের দুই পাশের গাছপালার মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে ঝুলন্ত সেতুগুলো। শক্ত দড়ি, জাল ও অন্যান্য টেকসই উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি সেতুগুলো মাটি থেকে বেশ উঁচুতে স্থাপন করা হয়। ফলে নিচে যানবাহন চলাচল করলেও ওপর দিয়ে নিরাপদে এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারে বন্যপ্রাণী।
সেতুগুলোর নকশায় রাখা হয়েছে একাধিক স্তর। এতে লেজের সাহায্যে চলাচলকারী বানর, হাত দিয়ে ঝুলে চলা প্রজাতি এবং হেঁটে চলাচলকারী ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীও সহজে সেতু পার হতে পারে। ইতোমধ্যে স্পাইডার মাঙ্কি, হাউলার মাঙ্কি, ক্যাপুচিন বানর, মারমোসেটসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীকে এসব সেতু ব্যবহার করতে দেখা গেছে। অলস ভালুক বা স্লথ এবং অপোসামজাতীয় ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর চলাচলও নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রতিটি সেতুর দুই পাশে বিশেষ ক্যামেরা স্থাপন করেছেন গবেষকেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে কোন প্রজাতির প্রাণী কতবার সেতু ব্যবহার করছে এবং কোন প্রাণী সেতুর কাছে এসেও ফিরে যাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন এই ব্যবস্থা ব্যবহারে সব প্রাণী সমান দ্রুত অভ্যস্ত হয় না। উদাহরণ হিসেবে একটি ক্যাপুচিন বানরগোষ্ঠীর প্রথম সেতু ব্যবহার করতে প্রায় সাত মাস সময় লেগেছিল।
পরিবেশবিদেরা বলছেন, বন্যপ্রাণীর মৃত্যু ঠেকানোর পাশাপাশি বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও সেতুগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সড়কের কারণে যখন একটি প্রাণীগোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তাদের প্রজনন ও বংশগত বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এই বিচ্ছিন্নতা কোনো কোনো প্রজাতির অস্তিত্বকেও বিপন্ন করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে ফলভোজী বানর বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ফলের বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে তারা। ফলে এসব প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে শুধু একটি প্রজাতিই নয়, পুরো বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্রাজিলে সড়ক দুর্ঘটনায় বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন সড়কে প্রতিবছর প্রায় ৯০ লাখ স্তন্যপায়ী প্রাণী মারা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন উজাড়, নতুন সড়ক নির্মাণ এবং যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের ওপর চাপ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে আলতা ফ্লোরেস্তার উদ্যোগটি ব্রাজিলের অন্যান্য অঞ্চলেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আগে দেশটির বিআর-১৭৪ মহাসড়কে স্থানীয় ওয়াইমিরি-আত্রোয়ারি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সহযোগিতায় অনুরূপ সেতু স্থাপন করা হয়েছিল। সেই প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই নতুন নকশা তৈরি করেছেন গবেষকেরা।
এদিকে ২০২৬ সালে ব্রাজিলের জাতীয় পরিবহন অবকাঠামো বিভাগ বন্যপ্রাণীর চলাচলের উপযোগী এই সেতুর নকশাকে মহাসড়কের জন্য সুপারিশকৃত মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশটির আইনসভায় বন্যপ্রাণীর সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় পরিকল্পনাসংক্রান্ত বিলও বিবেচনাধীন রয়েছে। এতে প্রয়োজনীয় স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণীদের চলাচলের জন্য বিশেষ অবকাঠামো তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।
ফার্নান্দা আব্রা ও তাঁর সহকর্মীরা প্রকল্পটি ব্রাজিলের আরও কয়েকটি বনাঞ্চল এবং প্রতিবেশী সুরিনামে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন। তাঁদের লক্ষ্য, কম খরচে কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী এমন অবকাঠামো তৈরি করা, যা একই সঙ্গে প্রাণী সংরক্ষণ ও মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে সাহায্য করবে।
ব্রাজিলের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশে লাউয়াছড়া, মধুপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে সড়কপথ চলে গেছে। এসব এলাকায় প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি চিহ্নিত করে উপযোগী বন্যপ্রাণী পারাপারব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। যথাযথ পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ থাকলে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ঘটিয়েও বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। আমাজনের ওপর ঝুলে থাকা ছোট ছোট সেতুগুলো সেই সম্ভাবনারই বাস্তব উদাহরণ।
মন্তব্য করুন