লিড নিউজ ২৪ ডেস্ক:
প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে আগামী কয়েক দিনে সমুদ্রপৃষ্ঠ স্বাভাবিকের তুলনায় সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার বা এক ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। এতে উপকূলীয় বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব ও সৈকত ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিশেষ ধরনের সামুদ্রিক ঢেউ—‘কোস্টাল ট্র্যাপড ওয়েভ’ বা ‘কেলভিন ওয়েভ’—প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ঘেঁষে উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি সুনামির মতো হঠাৎ করে তীরে আছড়ে পড়ে না। বরং সমুদ্রের পানির বিশাল একটি অংশ ধীরে ধীরে ফুলে উঠে উপকূল বরাবর এগিয়ে যায় এবং এর ফলে সাময়িকভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সমুদ্রবিজ্ঞানী ডিলন আমায়ার মতে, এই অতিরিক্ত পানির উচ্চতা যদি ঝড়ের জলোচ্ছ্বাস, বড় ঢেউ কিংবা অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ারের সঙ্গে একসঙ্গে ঘটে, তাহলে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বন্যা ও সৈকত ক্ষয়ের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
সমুদ্রের এই ঢেউ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ধীরে ধীরে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে ওরেগন ও ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের উপকূলেও প্রভাব ফেলতে পারে। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, এল নিনোর সময় এমন কেলভিন ওয়েভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক হলেও চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি এর প্রভাবকে আরও তীব্র করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে প্রশান্ত মহাসাগরের বড় আকারের ঢেউ ও উচ্চ জোয়ার। ফলে উপকূলের বালুকাময় সৈকত ক্ষয়ে গেলে প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে উপকূলবর্তী সড়ক, বাড়িঘর ও অন্যান্য অবকাঠামোতে ঢেউয়ের আঘাত এবং পানির অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়বে।
গবেষকদের মতে, অতীতের শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে ব্যাপক সৈকত ক্ষয় দেখা গেছে। বিশেষ করে ১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনো পর্বে উপকূলীয় ক্ষয় ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর সময় ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত উপকূলে বড় ঢেউয়ের ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলের অনেক উপকূলে ক্ষয়ের প্রবণতা বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি স্যাটেলাইট ও উপকূলীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানিয়েছেন, এল নিনোর পর্যায়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশের সৈকতে ক্ষয় তীব্র হয়।
তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলছেন, এই কেলভিন ওয়েভকে সুনামি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর প্রভাব মূলত সমুদ্রপৃষ্ঠের ভিত্তিগত উচ্চতা বাড়িয়ে দেয়। এরপর যদি শক্তিশালী ঝড়, বড় ঢেউ বা উচ্চ জোয়ার একই সময়ে উপকূলে আঘাত হানে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল নিয়ে সান ডিয়েগোর স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশেনোগ্রাফির গবেষকেরাও এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, উষ্ণ সমুদ্রপানি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ানোর পাশাপাশি পশ্চিম উপকূলে বড় ঢেউয়ের সম্ভাবনাও বাড়াতে পারে।
ফলে চলতি বছরের এল নিনো পরিস্থিতিতে ক্যালিফোর্নিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের সাময়িক উচ্চতা বৃদ্ধি, বড় ঢেউ এবং উপকূলীয় ক্ষয়—এই তিনটি বিষয় বিশেষ নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
মন্তব্য করুন