
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। মাঠটির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে সরকারের সঙ্গে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীদের বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। কৃষি গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দাবি করা মাঠটি রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, সেখানে সচিবালয় নির্মাণ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে শতাধিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে আয়োজনের প্রস্তুতি চলতে থাকা দুটি মেলার নির্মাণাধীন ফটক ও কয়েকটি স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরে যান।
এর আগে মঙ্গলবারও একই দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ওই দিন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তুতি হিসেবে মাটি পরীক্ষার কাজ চলাকালে শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে পরীক্ষার যন্ত্রাংশ ও দুটি গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে যান।
কেন সচিবালয় স্থানান্তরের বিরোধিতা?
শিক্ষার্থীদের দাবি, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি মূলত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি। আশির দশকে সামরিক শাসনামলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আয়োজনের জন্য সাময়িকভাবে মাঠটি ব্যবহার করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি।
তাঁদের বক্তব্য, কৃষিবিষয়ক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত জমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত এই মাঠে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাঠটির রক্ষণাবেক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং গবেষণার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন বলে দাবি তাঁদের।
শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, এখানে সচিবালয়ের মতো বিশাল প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মিত হলে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। পাশাপাশি সচিবালয়কেন্দ্রিক যানবাহন চলাচল, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অতিরিক্ত জনসমাগম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
মাঠটির আশপাশে একাধিক সরকারি হাসপাতাল থাকায় নতুন সচিবালয় নির্মাণের ফলে ওই এলাকার চিকিৎসাসেবা ও যান চলাচলেও চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।
মাঠের মালিকানা নিয়ে ভিন্ন অবস্থানে সরকার
শিক্ষার্থীরা মাঠটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি বলে দাবি করলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ দাবির সঙ্গে একমত নয়।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জমি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নয়, গণপূর্ত বিভাগের নামে রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা কেন মাঠটির মালিকানা দাবি করছেন, তা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ফলে সচিবালয় স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে এখন জমির প্রকৃত মালিকানা, ঐতিহাসিক ব্যবহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
২০২৯ সালের মধ্যে নতুন সচিবালয় চালুর পরিকল্পনা
গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে বর্তমান আবদুল গনি রোড থেকে বাংলাদেশ সচিবালয় শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন সচিবালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে সচিবালয়ের ১৭ দশমিক ৫৭ একর জমিতে ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ভবন ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। পুরোনো ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাবকে নতুন সচিবালয় নির্মাণের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে সরকার।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে আধুনিক সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। সেখানে তিনটি বেসমেন্টসহ ১২ তলাবিশিষ্ট ১৪টি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। মোট স্থাপনার আয়তন হবে প্রায় ৩৩ দশমিক ১৬ লাখ বর্গফুট।
এ ছাড়া প্রায় ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, মসজিদ, বহুমুখী মিলনায়তন, ক্যাফেটেরিয়া, ডাকঘরসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় সবুজায়ন ও জলাধার রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জরুরি পদক্ষেপের দাবি
সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে গত ২৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
আবেদনে তিন দিনের মধ্যে জরুরি সিন্ডিকেট সভা আহ্বান, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মাঠ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ এবং জমির স্বার্থ রক্ষায় হাইকোর্টে রিট আবেদন করার দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে মাঠে মেলার স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভাঙচুর এড়াতেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনিশ্চয়তায় সচিবালয় স্থানান্তর পরিকল্পনা
সরকারের পক্ষ থেকে সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আপত্তি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, গবেষণার মাঠ ফিরিয়ে দেওয়া এবং সেখানে সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিল না করা পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
এ পরিস্থিতিতে জমির মালিকানাসংক্রান্ত নথি যাচাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকার তার পরিকল্পনায় অটল থাকবে, নাকি শিক্ষার্থীদের আপত্তি বিবেচনায় নতুন করে সিদ্ধান্ত নেবে—সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
মন্তব্য করুন