জ্যোতি বাছাড় | ঢাকা
হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM) ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের “HRCBM: Six-Month Human Rights Report 2026” প্রকাশ করেছে। এ উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের হলরুম–১-এ “Equal Citizens, Equal Justice” প্রতিপাদ্যে এক জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অ্যাডভোকেট এবং HRCBM লিগ্যাল প্যানেলের সভাপতি ড. জে. কে. পল। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ, ধর্মতাত্ত্বিক গবেষক ও লেখক ড. মোহাম্মদ আব্দুল হাই, ঢাকা জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট ও HRCBM লিগ্যাল প্যানেলের সদস্য অ্যাডভোকেট জিতেন্দ্র বর্মন এবং HRCBM ইউরোপের আঞ্চলিক পরিচালক জয়া বর্মন। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ও HRCBM লিগ্যাল প্যানেলের সচিব শঙ্কর চন্দ্র দাস। এছাড়া সমন্বয়ক আশীষ কুমার অঞ্জন, দেবীচরণ, দীপক কুমার পাল, সঞ্জয় কুমার রাহাসহ সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, আইনজীবী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংস্থার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড় প্রতিবেদনের মূল তথ্য তুলে ধরে বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩টি জেলা এবং আটটি বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে ৮২৪টি সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছয় মাসে ২৩৪টি ভূমি দখল, সম্পত্তিতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, ২২৩টি অপহরণ ও শারীরিক হামলা, ১৬৮টি হত্যা ও রহস্যজনক মৃত্যু, ১৪১টি মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর, ৪১টি যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ১৭টি ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে HRCBM জানায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের রহস্যজনক মৃত্যু, বিশেষ করে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার ও অন্যান্য অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মব সহিংসতা, সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাঙচুরের ঘটনাও বাড়ছে বলে সংস্থাটি দাবি করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক। সংস্থাটির দাবি, বিভিন্ন অভিযোগ অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ কিশোরীদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছে এবং উদ্ধার হওয়া কয়েকজন যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার প্রকৃত সংখ্যা নথিভুক্ত ঘটনার তুলনায় আরও বেশি হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সম্মেলনে HRCBM সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জুডিশিয়াল কমিশন গঠন, ট্রানজিশনাল জাস্টিস বাস্তবায়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর কার্যকর তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানায়। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টার সঙ্গে HRCBM-এর একটি প্রতিনিধি দলের জরুরি বৈঠকের ব্যবস্থা করার আহ্বানও জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা বিশ্বাস নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাঁরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের শেষে HRCBM-এর পক্ষ থেকে গবেষক, মাঠপর্যায়ের তথ্যসংগ্রাহক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে মানবাধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
মন্তব্য করুন