স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁ:
২ দিন আগে
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৩৬ জন

নওগাঁয় সিজারের পর যমজ নবজাতকের একজন উধাও

ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, থানায় লিখিত অভিযোগ

 

নওগাঁর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর যমজ নবজাতকের মধ্যে একজনকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও অপর সন্তান কোথায়—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। এ ঘটনায় বলাকা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবার। এমনকি বিষয়টি ধামাচাপা দিতে পরিবারকে অর্থের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

 

এ ঘটনায় নবজাতকের বাবা শান্ত ইসলাম নওগাঁ সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

 

আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে ছিল যমজ সন্তানের তথ্য

 

ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রসূতি শান্তনা আক্তারের গর্ভাবস্থায় গত ১২ ও ২১ অক্টোবর দুটি পৃথক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়। উভয় রিপোর্টেই গর্ভে দুটি জীবিত ভ্রূণ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

 

১২ অক্টোবর জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিবেদনে দুটি জীবিত ভ্রূণের উপস্থিতির কথা বলা হয়। উভয়ের হৃদস্পন্দন ছিল প্রতি মিনিটে ১৪৭ বার।

 

অন্যদিকে, ২১ অক্টোবর নওগাঁর রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্টেও দুটি জীবিত ভ্রূণের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে তাদের হৃদস্পন্দন যথাক্রমে প্রতি মিনিটে ১৪৬ ও ১৪০ বার এবং সম্ভাব্য ওজন ২ হাজার ৩৩১ ও ২ হাজার ৪৮৬ গ্রাম উল্লেখ করা হয়।

 

সিজারের পর একটি সন্তান হস্তান্তর, অপরটির খোঁজ নেই!

 

প্রসূতির স্বামী শান্ত ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শে তাঁর স্ত্রীকে নওগাঁর বলাকা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। পরে ওই চিকিৎসকের মাধ্যমেই সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

 

অস্ত্রোপচারের পর পরিবারের কাছে একটি কন্যাসন্তান হস্তান্তর করা হলেও দ্বিতীয় সন্তান সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে তারা নানা ধরনের গড়িমসি করে। একপর্যায়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আর্থিক প্রস্তাব দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন শান্ত ইসলাম।

 

কোনো সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

 

প্রসূতির অভিযোগ: সেলাই না করে ফেলে রাখা ও ভিডিও ধারণ করে হুমকি

 

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রসূতি শান্তনা আক্তার বলেন, “ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শেই আমি ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলাম। অপারেশন ও আল্ট্রাসনোগ্রাম অনুযায়ী আমি দুটি সন্তানের মা হওয়ার কথা জানতাম। কিন্তু সিজারের পর আমাকে কেবল একটি মেয়ে সন্তান দেখানো হয়।”

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাঁর পেটের অস্ত্রোপচারের কাটা অংশ সেলাই না করেই প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ফেলে রাখা হয়। এ সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

 

শান্তনা আক্তারের ভাষ্য, পরবর্তীতে তাঁর শরীরে কাঁপুনি শুরু হলে তিনি বাধ্য হয়ে তাদের শর্ত মেনে নিতে রাজি হন। এরপর চিকিৎসকের রাগারাগি ও হুমকির মুখে তাঁর পেটের সেলাই সম্পন্ন করা হয়।

 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি আমার দুটি সন্তানকেই ফিরে পেতে চাই। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”

 

ক্লিনিক মালিকের বক্তব্য

 

বলাকা ক্লিনিকের মালিক এনামুল হক বলেন, “ডা. মাহফুজা খাতুনের রোগী হিসেবে তাঁর পরামর্শেই ওই প্রসূতি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং চিকিৎসক নিজেই অপারেশন করেছেন। সন্তান একটি না দুটি হয়েছে, তা একমাত্র চিকিৎসকই বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।”

 

অন্যদিকে, অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি গণমাধ্যমের কাছে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

 

তদন্তের আশ্বাস পুলিশের

 

এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, নবজাতকের বাবা থানায় এসে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) পুলিশ পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনিয়ম বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি

 

এ ঘটনায় নওগাঁর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অপরাধে জড়িত প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

 

একই সঙ্গে সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অনুমোদন, চিকিৎসাসেবা, জনবল এবং ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে তদারকির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

 

তাঁদের প্রশ্ন, দেশে কতগুলো ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে, আর কতগুলো অনুমোদনহীনভাবে চলছে—স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কাছে কি তার সঠিক হিসাব রয়েছে?

 

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো পরিবারকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না। চিকিৎসাসেবার নামে কোনো অনিয়ম, অবহেলা কিংবা অপরাধের সুযোগ যেন কেউ না পায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপির সমাবেশ, জামায়াতের উপযুক্ত স্থান পাকিস্তান: পাপিয়া

১

টঙ্গীতে কলেজ রোড ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির পরিচিতি সভা ও দোয়া মাহফিল

২

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আ/হত ১০

৩

সৌদি আরবে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে ৭ বাংলাদেশি নি/হত

৪

সাভারে গুলিসহ একজন সন্ত্রাসীকে গ্রে/ফতার করেছে ডিবি

৫

ডিমলায় ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত

৬

সুনামগঞ্জে বিএনপির উদ্যোগে ৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত

৭

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে কেন্দুয়ায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

৮

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

৯

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বাণী

১০

ধামইরহাটে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত

১১

অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান ত্রাণমন্ত্রীর

১২

বীরগঞ্জে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কর্মসূচিতে_এমপি আলহাজ্ব মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু

১৩

মনোহরগঞ্জ উন্নয়ন ফোরামের উদ্যোগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান

১৪

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

১৫

যশোরে স্ত্রীকে পরকীয়ার সন্দেহে হত্যা, স্বামীর থানায় আত্মসমর্পণ

১৬

দুই পর্বে পাকিস্তানের রাইউইন্ড ইজতেমা, প্রথম পর্ব শুরু আজ

১৭

চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি আহত, ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ

১৮

পোশাক খাতে অস্থিরতা: ব্যাংক হিসাব জব্দে আতঙ্ক ব্যবসায়ী মহলে, প্রশ্নের মুখে এনবিআরের পদক্ষেপ

১৯

নওগাঁয় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রান গেল অনার্স পড়ুয়া এক মেধাবী ছাত্রের।

২০