রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে নেওয়া ব্যবস্থায় নির্দোষ উদ্যোক্তারাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ; ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম।
নিজস্ব প্রতিবেদক | লিড নিউজ ২৪
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যাপক পরিসরে ব্যাংক হিসাব জব্দ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য তলবের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে ব্যবসায়ী মহলে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কিংবা অতীতের ব্যবসায়িক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা তালিকায় এমন অনেক শিল্পোদ্যোক্তার নামও এসেছে, যাঁদের বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি বা অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে আসেনি।
পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টিতে অর্থায়নের সন্দেহে সম্প্রতি দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় এনবিআর। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল পৃথকভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের আর্থিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বাইরেও তালিকায় ব্যবসায়ী
ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর উদ্যোক্তাদের নাম রয়েছে।
এতে মণ্ডল গ্রুপ, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, তুসুকা গ্রুপ, ওয়েল গ্রুপ, নিপা গ্রুপ ও গিভেন্সি গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
বিশেষ করে কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অন্য অংশীদার বা পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবও জব্দের আওতায় এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, যথাযথ যাচাই ছাড়া এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শেলটেক ও স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের উদ্যোক্তাদের ক্ষোভ
শেলটেক গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ এবং তাঁর মা রাশিদা আহমেদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাঁদের সরাসরি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। অতীতে অন্য একটি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকলেও কয়েক বছর আগেই সেই অংশীদারত্বের অবসান হয়েছে।
তানভীর আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগ থাকলে আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া যেত। যথাযথ তদন্ত ও তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি এড়ানো সম্ভব হতো।
অন্যদিকে দেশের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কয়েকজন উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে।
গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসনাত মোশাররফ দাবি করেছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়। শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের ঘটনাকে মালিকপক্ষের উসকানির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই বলেও তিনি মনে করেন।
শ্রমিকদের বেতন ও উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
ব্যাংক হিসাব জব্দের সিদ্ধান্তের প্রভাব ইতিমধ্যে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পড়তে শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তুসুকা গ্রুপের একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছু শ্রমিকের বেতন পরিশোধে সমস্যা হয়েছে। গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন একদিন বন্ধ থাকলে এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, আর্থিক লেনদেনে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়, শ্রমিকদের জীবিকা, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএর উদ্বেগ
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক মনে করেন, শ্রমিক আন্দোলনে বাইরের কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা থাকলে অবশ্যই তা তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগের যথাযথ ভিত্তি নিশ্চিত না করে ব্যাপকভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যবসায়ীদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়াও জরুরি।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। পুরো তালিকা পর্যালোচনা করে বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সরকারের অভিযোগ
এদিকে তৈরি পোশাকশিল্পে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও শিল্পমালিকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে শিল্প খাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।
এরপরই সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের কার্যক্রম জোরদার করে এনবিআর।
তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়ার অর্থ তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়।
শিল্প খাতে আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করছে, দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন এবং রাষ্ট্রীয় তদন্ত কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি নির্দোষ উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত ও স্বচ্ছ যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, তদন্তের নামে নির্বিচারে আর্থিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক শিল্প বিনিয়োগের পরিবেশেও পড়তে পারে।
মন্তব্য করুন