
রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ এবং পরদিন তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে নতুন তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। এবার তাঁর মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তবে মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। এবার মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নতুন সূত্র পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া, মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির অবস্থান নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। প্রথম আলো +1
মরদেহ উদ্ধারের স্থানেই মিলল নতুন সূত্র
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। জায়গাটি তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটের খুব কাছে, যেখান থেকে গত বুধবার তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
পিবিআই সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি তাহসিফের হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেটির প্রকৃত মালিকানা এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
মোটরসাইকেলটি বর্তমানে রাজধানীর উত্তরখান থানায় রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় নৌ পুলিশের তদন্তে সহযোগিতা করছে পিবিআই।
বন্ধু দীপের হেফাজতে থাকা ও সিসিটিভির ফুটেজ
তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য অনুসন্ধানে এর আগেই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সামনে আসে একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ। সেখানে নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁকে এক যুবকের সঙ্গে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ওই যুবককে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন।
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটের দিকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের গ্যারেজের সামনে তাহসিফ ও দীপকে দেখা যায়। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তাঁরা আলাদা মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
পরবর্তী সময়ে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে দীপের অবস্থান ও তাঁদের চলাচল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে দীপের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি এখনো প্রমাণিত হয়নি। প্রথম আলো
মাকে জানিয়েছিলেন ফিরছেন, কিন্তু আর ফেরা হয়নি
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর গভীর রাতেও তাহসিফ বাড়ি ফেরেননি। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে পাঠানো একটি ভয়েস মেসেজে তিনি বাড়ি ফিরছেন বলে জানান।
এরপর তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে শুরু থেকেই পরিবারের সন্দেহ রয়েছে। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের দাবি, এটি আত্মহত্যার ঘটনা নয়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা এবং কেউ দায়ী থাকলে তাদের পরিচয় উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মাদককারবারিদের ধাওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পিবিআই
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকাটি মাদক কেনাবেচার জন্য পরিচিত। সেখানে মাদককারবারিদের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ নদীতে পড়ে গিয়ে ডুবে থাকতে পারেন—এমন একটি সম্ভাবনার কথাও বলেছে পিবিআই।
তবে এটি এখন পর্যন্ত কেবল তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রাথমিক অনুমান। তাহসিফকে কেউ ধাওয়া করেছিল কি না কিংবা কী পরিস্থিতিতে তিনি নদীতে পড়েছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। প্রথম আলো
নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল নিয়ে নতুন প্রশ্ন
তদন্তে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ যে মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন, সেটির পেছনে কোনো নম্বরপ্লেট দেখা যায়নি। নতুন উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটিতেও নম্বরপ্লেট নেই।
এই মিলের ভিত্তিতে মোটরসাইকেলটি তাহসিফের হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও শুধু নম্বরপ্লেট না থাকার বিষয়টি মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
এরই মধ্যে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার জানাজা শেষে উত্তরায় তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং সম্ভাব্য অপরাধসংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, শেষবার কারা তাঁর সঙ্গে ছিলেন এবং কীভাবে তিনি তুরাগ নদে পৌঁছালেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘটনাটির রহস্য উন্মোচিত হতে পারে।
মন্তব্য করুন