
রাজধানীর উত্তরায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে থাকা বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই দীপকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। রহস্যজনক এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে দীপকে পিবিআই হেফাজতে নেওয়া হয়। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে দীপ তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ওই রাতে তাঁদের চলাফেরা, অবস্থান এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে দীপকে পিবিআই মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য যাচাইয়ের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্যও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
মাকে জানিয়েছিলেন ফিরছেন, কিন্তু আর ফেরা হয়নি
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন।
কিন্তু সেই ফেরার অপেক্ষা শেষ হয়নি। পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
ঘটনার পর থেকেই পরিবারের সদস্যরা তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও সঙ্গে ছিল। তবে মরদেহ উদ্ধারের পরও মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
সিসিটিভি ফুটেজে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপ বাসার নিচে এসে তাহসিফকে ডাকেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন জানিয়ে বাসা থেকে নিচে নামেন তাহসিফ।
বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে দুজন পৃথক মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
অন্য একটি সিসিটিভি ফুটেজে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের গ্যারেজের সামনে তাহসিফকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে দেখা যায়। তাঁরা হাত মেলানোর পর আলাদা মোটরসাইকেলে স্থান ত্যাগ করেন। ওই ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চাইছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মৃত্যুকে স্বাভাবিক মানতে নারাজ পরিবার
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে মানতে নারাজ। তাঁর ধারণা, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা এবং কেউ জড়িত থাকলে তাদের পরিচয় প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হলে জানাজা শেষে উত্তরায় তাঁকে দাফন করা হয়।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পিবিআই
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে কোথায় গিয়েছিলেন, কার কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, তাঁর মোটরসাইকেল কোথায় এবং মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।
তবে দীপকে হেফাজতে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তকারীরা তাঁর বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণের চেষ্টা করছেন।
ময়নাতদন্তের ফলাফল এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
মন্তব্য করুন