লিড নিউজ ২৪ ডেস্ক | সিলেট | ২৯ অক্টোবর ২০২৬:
সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনের শিকার হয়ে রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় দীর্ঘ ছয় বছর পর রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। বহুল আলোচিত এই মামলায় প্রধান আসামি পুলিশের বরখাস্ত হওয়া উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলায় অপর দুই পুলিশ সদস্য কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহী, উপপরিদর্শক হাসান উদ্দিন এবং সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
আলোচিত এ মামলার ছয় আসামির মধ্যে রায় ঘোষণার সময় কেবল আশেক এলাহী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান আসামি আকবরসহ বাকি পাঁচজন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন রায় ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০২০ সালের ১০ অক্টোবর গভীর রাতে সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় ৩৪ বছর বয়সী রায়হান আহমদকে। সেখানে তাঁকে নির্মম নির্যাতন করা হয় বলে মামলার তদন্তে উঠে আসে। পরদিন ১১ অক্টোবর গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ময়নাতদন্ত ও তদন্তে রায়হানের শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তাঁর শরীরে ৯৭টি আঘাতের চিহ্ন থাকার তথ্যও উঠে আসে। এমনকি হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলার মতো ভয়াবহ নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়হানের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। ঘটনাটি সিলেটসহ সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন ও প্রতিবাদ শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে সিলেট মহানগর পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও রায়হানকে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া যায়। ঘটনার পর বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আরও তিনজনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তের ধারাবাহিকতায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২১ সালের ৫ মে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রমে সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর অবশেষে এই রায় ঘোষণা করা হলো।
তবে রায় ঘোষণার আগেই প্রধান আসামি আকবরের জামিনে মুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে পলাতক হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে তাঁর জামিন স্থগিত করে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি আর আদালতে হাজির হননি।
রায়ের আগে নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম আসামিদের পলাতক থাকার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের বিচারপ্রত্যাশা এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাস্তি কার্যকর হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা।
ছেলের হত্যার বিচার পেতে ছয় বছর অপেক্ষার পর আদালতের রায় এলেও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই পলাতক থাকায় পরিবারের উদ্বেগ কাটেনি।
রায়হান হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনায় জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছিল। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই রায় সেই আলোচিত মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তবে আদালতের রায় ঘোষণাই বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ নয়। দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার, পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া এবং সাজা কার্যকরের বিষয়গুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন