বিশেষ প্রতিনিধি | নয়াদিল্লি
দিল্লির যন্তর মন্তরে দেশের ছাত্র ও যুবসমাজের ব্যানারে শুরু হওয়া আন্দোলন এক নতুন মোড়ে পৌঁছেছে। টানা ২৬ দিন অনশন পালনের পর অবশেষে অনশন ভঙ্গ করেছেন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুক। তবে কেন্দ্র সরকারের আশ্বাসের ভিত্তিতে ওয়াংচুক অনশন তুললেও, আন্দোলনকারী দল ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) জানিয়েছে—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত যন্তর মন্তরে তাদের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন ভঙ্গ ও কেন্দ্রীয় সরকারের আশ্বাস
বৃহস্পতিবার রাতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে অনশন ভঙ্গ করেন সোনম ওয়াংচুক। সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর কেন্দ্র কিছু লিখিত আশ্বাস দিয়েছে:
মামলা প্রত্যাহার: অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে।
ক্ষতিপূরণ বিবেচনা: নিট (NEET) পরীক্ষা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে যেসব পরীক্ষার্থী মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।
ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠন: পেপার লিক (প্রশ্নপত্র ফাঁস) এবং পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের মতো ঘটনার দ্রুত ও কঠোর বিচারের জন্য বিশেষ ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দিল্লি হাইকোর্ট ইতোমধ্যেই ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের জন্য বিশেষ বিচারক নিযুক্ত করেছে।
CJP-র কড়া অবস্থান: “পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে”
সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙলেও ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে এবং মুখ্য মুখপাত্র সৌরভ দাস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আন্দোলন থামছে না। তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষার অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি ঢাকতে শুধুমাত্র প্রশাসনিক রদবদল যথেষ্ট নয়।
অভিজিৎ ডিপকে অভিযোগ করেন, শিক্ষা সচিবকে বদলি করে যার হাতে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধেও গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “দুর্নীতিগ্রস্তদের সাজা দেওয়ার বদলে সরকার তাদের পুরস্কৃত করছে। শিক্ষা সচিব বদলে আরেকজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া দেশের কোটি কোটি যুবকের মুখে চরম অপমান। আমরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া রাজপথ ছাড়ব না।”
নিরাপত্তার কড়াকড়ি: বন্ধ ১৮টি মেট্রো স্টেশন
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা এড়াতে দিল্লির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দিল্লি পুলিশের সমস্ত কর্মকর্তার ছুটি আপাতত বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া যন্তর মন্তর ও সংসদ ভবনের আশেপাশের এলাকাগুলোতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (DMRC) মোট ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করেছে। বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক, মান্ডি হাউস, আইটিও, খান মার্কেট এবং রামকৃষ্ণ আশ্রম মার্গ। এসব স্টেশনে যাত্রী ওঠা-নামা এবং মেট্রো ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক উত্তাপ
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে আইন নিজেদের হাতে না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং পেপার লিক কাণ্ডে কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে বিরোধী দলগুলো দিল্লি পুলিশের বলপ্রয়োগ ও দমনপীড়নের তীব্র সমালোচনা করেছে।
সংবিধান ক্লাবে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারী CJP প্রতিনিধিদের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছাত্রনেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন থামবে না।
মন্তব্য করুন