সায়মন খান | লিড নিউজ ২৪
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশি প্রায় তিন বছর ধরে দেশটির কারাগারে আটক থাকলেও তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিষয়ে কোনো তথ্য জানত না বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বা পরেও সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অবহিত করেনি।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রমকল্যাণ উইং থেকে গত ১৮ অক্টোবর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি গোপনীয় চিঠির বরাতে প্রকাশিত তথ্যে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তার। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
সৌদি গণমাধ্যমের খবরেই প্রথম জানতে পারে বাংলাদেশ
কনস্যুলেটের পাঠানো চিঠি অনুযায়ী, সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির ভিত্তিতে দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন বাংলাদেশি কূটনৈতিক কর্মকর্তারা।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘন করেছিলেন ওই দুই বাংলাদেশি। এ অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শেষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
তবে ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার তথ্যও বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনের হাতে পৌঁছায়নি।
২০২৩ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন দুজন
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের তথ্য চেয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল জেদ্দা কনস্যুলেট।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি বন্দিতালিকা পাওয়া যায়। সেই তালিকায় নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তারের নাম থাকলেও তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কিংবা সম্ভাব্য শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না।
তালিকার তথ্য বলছে, তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুল ইসলামকে আটক করা হয়। পরদিন ২ আগস্ট ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সুইটি আক্তার।
আটকের পর নজরুল ইসলামকে জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি আক্তারকে জেদ্দার নারী কারাগারে রাখা হয়েছিল।
দুজনই সৌদি আরবের ‘আল মাজাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে কনস্যুলেটের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে বন্দিতালিকায় উল্লিখিত অভিযোগের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণ হিসেবে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বক্তব্যের সম্পর্ক কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কারাগারে আরও ৩০৬ বাংলাদেশির তথ্য
জেদ্দা কনস্যুলেটের চিঠিতে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে নৈতিকতাসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সাজাপ্রাপ্তদের সর্বনিম্ন কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছর।
কনস্যুলেটের চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে এর আগে সৌদি আরবে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড হওয়ার নজির তাদের জানা নেই।
আইনি সহায়তার আবেদনও পায়নি কনস্যুলেট
দুই বাংলাদেশির বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে তথ্যের ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
কনস্যুলেটের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজনের পরিবারের পক্ষ থেকে আগে কোনো আইনি সহায়তার আবেদন পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, এমন তথ্যও তাদের কাছে নেই।
অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা কিংবা তা কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে অবহিত করেনি।
ফলে মামলার বিচারিক কার্যক্রম, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আইনগত সহায়তার বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা রয়েছে।
সৌদি সরকারের কাছে রায়ের অনুলিপি চেয়েছে বাংলাদেশ
এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এবং আদালতের রায়ের অনুলিপি সংগ্রহে উদ্যোগ নিয়েছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল।
এ লক্ষ্যে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মামলার রায়ের অনুলিপি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে কনস্যুলেটের চিঠিতে জানানো হয়েছে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এখন শুধু তাঁদের পরিবারের জন্য শোকের বিষয় নয়; বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আগাম তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়াকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চাওয়া নথিপত্র পাওয়া গেলে এ ঘটনার বিচারিক ও কূটনৈতিক দিকগুলো আরও স্পষ্ট হতে পারে।
মন্তব্য করুন