নিউজ ডেস্ক | লিড নিউজ ২৪
টাঙ্গাইল, ২০ অক্টোবর ২০২৬: পরিবারের অভাব দূর করতে আর সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের সুইটি আক্তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। প্রবাসে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রেপ্তার হন তিনি। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর আগের সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হলেও নিজের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছুই জানাননি সুইটি।
মেয়ের মৃত্যুর খবরে এখন শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। অসহায় মা-বাবার একটাই আকুতি—অন্তত শেষবারের মতো মেয়ের মুখ দেখতে চান তাঁরা। তাই সুইটির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে সরকারের সহায়তা কামনা করছেন স্বজনেরা।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাসিন্দা মো. ফজল মিয়া ও জহুরা বেগমের পাঁচ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন সুইটি আক্তার। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা সুইটির জীবন শুরু থেকেই ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর বিয়ে হয়। তবে সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিচ্ছেদের পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেও সেখানেও সুখের দেখা পাননি। দ্বিতীয় স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
এমন পরিস্থিতিতে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সুইটি। ২০২৩ সালের মার্চে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে যান তিনি। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
কিন্তু বিদেশে যাওয়ার প্রায় ছয় মাসের মাথায় বদলে যায় তাঁর জীবন। হঠাৎ একদিন পরিবারের কাছে ফোন করে জানান, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বাবা ফজল মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সুইটি তখন জানিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করা কয়েকজন নারী অবৈধভাবে একটি গাড়ি কেনার ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে সুইটিকেও আটক করা হয়। তবে পরিবারের কাছে দেওয়া এই বিবরণের সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অভিযোগের পার্থক্য রয়েছে।
কারাগারে যাওয়ার পরও প্রথমদিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন সুইটি। কখনো সপ্তাহে একবার, আবার কখনো মাসখানেক পর ফোন করতেন। একপর্যায়ে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় এক বছর পর আবার ফোন করে নিজের কারাবন্দী অবস্থার কথা জানান তিনি।
সুইটি পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করতেন, ফোন না পেলেও যেন তাঁরা দুশ্চিন্তা না করেন।
শেষ ফোনেও মৃত্যুদণ্ডের কথা জানাননি
গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের পর বাবার সঙ্গে শেষবার কথা হয় সুইটির। সেদিনও স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছিলেন তিনি। নিজের বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাবাকে কিছু জানাননি।
পরদিন ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে সুইটি আক্তার ও আরেক বাংলাদেশি নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। পরে মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ জানতে পারে পরিবার।
হঠাৎ এমন ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন সুইটির বৃদ্ধ মা-বাবা। মেয়ের স্মৃতি মনে পড়লেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা জহুরা বেগম। তাঁর আকুতি, মেয়েকে জীবিত আর ফিরে পাবেন না, অন্তত মরদেহটি যেন দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সুইটির স্বজনদের দাবি, তিনি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন—এমন অভিযোগ তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁদের আশঙ্কা, প্রবাসে কোনো পরিস্থিতি বা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে থাকতে পারেন তিনি। তবে পরিবারের এই আশঙ্কার পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
মায়ের অপেক্ষায় নয় বছরের সন্তান
সুইটির জীবনের সবচেয়ে করুণ দিক হয়ে উঠেছে তাঁর নয় বছর বয়সী মেয়ের ভবিষ্যৎ। মাকে ছাড়া বেড়ে ওঠা শিশুটি বর্তমানে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।
বিদেশে যাওয়ার সময় মেয়েকে এক বোনের কাছে রেখে গিয়েছিলেন সুইটি। তাঁর আশা ছিল, প্রবাসের উপার্জনে সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন।
কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই জীবনাবসান ঘটেছে তাঁর।
সুইটির চাচাতো বোন সালমা আক্তার জানিয়েছেন, পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা দূর করার জন্যই বিদেশে গিয়েছিলেন সুইটি। তাঁর বাবা কঠোর পরিশ্রম করে সংসার চালান। এমন পরিণতি হবে জানলে তাঁরা কখনোই তাঁকে বিদেশে যেতে দিতেন না।
সৌদি আরবের কাছে বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সুইটি আক্তার ও নজরুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন শেষে ১৪ অক্টোবর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযুক্ত কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি।
এদিকে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত না করার বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মামলার বিস্তারিত তথ্য, আদালতের রায়ের অনুলিপি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের তথ্য উল্লেখ না থাকার বিষয়টিও উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ।
মরদেহ দেশে ফেরানোর আকুতি
সুইটির মৃত্যুতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যে মেয়েটি পরিবারের অভাব দূর করতে হাজার মাইল দূরে গিয়েছিলেন, তাঁর এমন পরিণতি কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
পরিবারের সদস্যরা এখন সুইটির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। একই সঙ্গে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
প্রবাসে জীবিকার সন্ধানে গিয়ে চরম পরিণতির শিকার সুইটির ঘটনা তাঁর পরিবারের সামনে রেখে গেছে গভীর শোক, অনিশ্চয়তা এবং নয় বছরের এক শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ।
মন্তব্য করুন