আন্তর্জাতিক ডেস্ক | লিড নিউজ ২৪
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে বিক্ষোভে আপত্তিকর মন্তব্য করার পর এক কিশোরীর জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাত্র ১১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি, অনলাইন হয়রানি এবং আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয় ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরীকে। নিরাপত্তার আশঙ্কায় মায়ের সঙ্গে একাধিকবার বাসা পরিবর্তন করেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি সে। বন্ধ হয়ে গেছে স্কুলে যাওয়া।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কাছে বসবাসকারী ওই কিশোরীর দুর্বিষহ জীবনের চিত্র। পরিচয় গোপন রাখতে প্রতিবেদনে তাকে ‘আর’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৪ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেয় ওই কিশোরী। সে সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে তার করা অশালীন মন্তব্যের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই শুরু হয় বিতর্ক।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থকদের একাংশ তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। অভিযোগ ওঠে, কিশোরীর ব্যক্তিগত তথ্য, ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা প্রকাশ করে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
কিশোরীর দাবি, অপরিচিত ব্যক্তিরা ফোন করে তাকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি তার অবস্থান জানিয়ে দেওয়ার জন্য ১১ হাজার এবং মারধরের জন্য ২১ হাজার রুপি পুরস্কার ঘোষণার কথাও জানানো হয়।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কিশোরী ও তার মা বাসা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। একাধিকবার বাসা পরিবর্তনের কারণে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে পরিবারটি। কিশোরীর মা গৃহশিক্ষকতা করে সংসার চালাতেন। নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে সেই আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য নিজের স্বর্ণালংকার বিক্রি করেছেন তিনি।
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিশোরী জানায়, ঘটনার পর থেকে নিজেকে অপরাধীর মতো মনে হচ্ছে তার। নিজের দেশেই তাকে শত্রুর মতো বিবেচনা করা হচ্ছে বলে আক্ষেপ করে সে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে কিশোরীর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে সে নিজের বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চায়।
ক্ষমা চাওয়ার ভিডিওতে কিশোরী জানায়, নিজের আচরণের জন্য সে অনুতপ্ত এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল আর করবে না।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অশালীন ভাষা ব্যবহারের সমালোচনা করলেও তাদের ক্ষমা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তরুণদের ভুল পথে না ঠেলে সঠিক পথ দেখানো প্রয়োজন।
পরবর্তী সময়ে অভিযোগকারী তাঁর অভিযোগ প্রত্যাহার করেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু আইনি জটিলতা কমলেও কিশোরীর প্রতি হুমকি ও হয়রানি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।
গত আগস্টের শেষ দিকে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে কিশোরী সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে উদ্দেশ করে জানায়, তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কোথাও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছে না সে। নিজের পরিচয় গোপন রেখে তাকে দিন কাটাতে হচ্ছে।
এই ঘটনার পর কিশোরীর পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘদিন স্কুলে যেতে না পারায় সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেছে। কয়েকজন বন্ধুও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
ভারতে চলমান তরুণদের আন্দোলন নতুন করে আলোচনায় আসার মধ্যেই কিশোরীর অভিজ্ঞতা দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনলাইন হয়রানি এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সম্প্রতি ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। যদিও ক্ষমতাসীন বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে, প্রায় তিন মাস ধরে ঘরবন্দী জীবন কাটানো কিশোরী এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে তার স্বপ্নও বদলে গেছে। এখন তার প্রধান লক্ষ্য নিরাপদে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং বোর্ড পরীক্ষায় ভালো ফল করা।
রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে এভাবে হুমকি ও সামাজিক হয়রানির মুখে পড়তে হওয়ায় ভারতে নাগরিক অধিকার এবং শিশু সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মন্তব্য করুন