লিড নিউজ ২৪ ডেস্ক:
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই বিভীষিকাময় দিনটিতে মৃত্যুর দুয়ার থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন দুই অপরিচিত মানুষ— স্ট্যানলি প্রেইমনাথ এবং ব্রায়ান ক্লার্ক।
টুইন টাওয়ারের সাউথ টাওয়ারে বিমান হামলার ঠিক উপরের ফ্লোরগুলো থেকে যে চারজন জীবিত ফিরতে পেরেছিলেন, স্ট্যানলি ও ব্রায়ান তাদের অন্যতম। ৮১ তলার ধোঁয়া আর আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে আচমকাই তাদের দেখা হয়েছিল। এরপর সেখান থেকে ১,৬২০টি সিঁড়ি পেরিয়ে তারা শুধু জীবনেই ফিরে আসেননি, গড়ে তুলেছিলেন আজীবনের এক অটুট বন্ধন, পরিণত হয়েছিলেন ‘ব্লাড ব্রাদার্স’-এ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২৫ বছর আগের সেই ভয়াল দিনের কথা এবং বেঁচে ফেরা এই দুই বন্ধুর বর্তমান জীবনের গল্প।
যেভাবে শুরু সেই বন্ধুত্বের
ঘটনার দিন সকালে ৮৪ তলার ইউরো ব্রোকার্সে নিজের ডেস্কে কাজ করছিলেন কানাডিয়ান নাগরিক ব্রায়ান ক্লার্ক (বর্তমানে ৭৯)। অন্যদিকে ৮১ তলায় ফুজি ব্যাংকের লোন অফিসার হিসেবে সবে কাজ শুরু করেছিলেন গায়ানায় জন্মগ্রহণকারী স্ট্যানলি প্রেইমনাথ।
সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আছড়ে পড়ে। বিমানটি ৭৭ থেকে ৮৫ তলা পর্যন্ত ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। স্ট্যানলি তখন ডেস্কের নিচে লুকিয়ে প্রাণপণে প্রার্থনা করছিলেন। তার চারপাশের দেয়ালগুলো ধসে পড়েছিল, এবং একটি জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়েছিলেন তিনি।
ঠিক তখনই উপর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করছিলেন ব্রায়ান ক্লার্ক ও তার কয়েকজন সহকর্মী। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে স্ট্যানলির বাঁচার আকুতি শুনতে পান ব্রায়ান। সহকর্মীরা উপরে ছাদে আশ্রয়ের আশায় চলে গেলেও ব্রায়ান নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্ধকার আর ধোঁয়ার ভেতর থেকে স্ট্যানলিকে উদ্ধার করেন।
ব্রায়ান যখন ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে স্ট্যানলিকে টেনে বের করেন, তখন আবেগাপ্লুত স্ট্যানলি তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “আমি স্ট্যানলি প্রেইমনাথ; আমরা সারাজীবনের জন্য ভাই হয়ে গেলাম।” ব্রায়ান তখন স্ট্যানলির রক্তাক্ত হাতের সাথে নিজের হাত মিলিয়ে বলেছিলেন, “হ্যাঁ, আজ থেকে আমরা ব্লাড ব্রাদার্স। চলো বন্ধু, এবার বাড়ি ফেরা যাক।”
২৫ বছর পরের জীবন
২৫ বছর পর এই দুই ‘ব্লাড ব্রাদার্স’ এখন জীবনের পড়ন্ত বেলায়। ব্রায়ান ক্লার্ক ২০০৬ সালে অবসর নিয়ে বর্তমানে নিউ জার্সিতে স্ত্রীর সাথে বসবাস করছেন। তিনি এখন ১১ জন নাতি-নাতনি এবং দুই প্রপৌত্র-প্রপৌত্রীর দাদা। আর স্ট্যানলি প্রেইমনাথ ২০০৬ সালে যাজক (প্যাস্টর) হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন এবং গত দুই বছর আগে ব্যাংকিং পেশা থেকে অবসর নেন।
বেঁচে ফেরার পর থেকে তারা দুজনেই শত শত চার্চ, স্কুল ও টিভিতে তাদের এই অবিশ্বাস্য গল্প শুনিয়েছেন। ব্রায়ানের ভাষায়, “এটি হয়তো ৮০০ থেকে ১,২০০ বার হবে।” স্ট্যানলির কাছে এই গল্প শোনানোটা কোনো একঘেয়েমি নয়, বরং তার মতে, এটি তার কাঁধের বোঝা নামানো এবং চোখের জলে আত্মাকে ধুয়ে ফেলার মতো।
বর্তমানের পৃথিবী নিয়ে হতাশা ও আশা
দীর্ঘ এই ২৫ বছরে বিশ্ব অনেক বদলে গেছে। ব্রায়ান ক্লার্ক এখন একজন কট্টর শান্তিবাদী। বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধ-সংঘাত, বিশেষ করে ইউক্রেন, রাশিয়া ও গাজায় সাধারণ মানুষের ওপর বোমা বর্ষণ তাকে চরম হতাশ করে। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর রাস্তায় মানুষের উল্লাসকেও তিনি মেনে নিতে পারেননি। তার মতে, “বিচার হতে পারে, কিন্তু অন্য মানুষের মৃত্যুতে উল্লাস করা আমাদের কাজ হতে পারে না।”
অন্যদিকে স্ট্যানলি প্রেইমনাথ ৯/১১-এর পরপরই আমেরিকানদের মাঝে যে ঐক্য দেখেছিলেন, তা আজও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “৮১ তলার সেই ধ্বংসস্তূপে কোনো রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট ছিল না, কোনো সাদা বা কালো ছিল না। আমরা ছিলাম কেবলই ভাই, যারা একসাথে বাঁচার পথ খুঁজছিলাম।”
মন্তব্য করুন