(চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
লোকসংস্কৃতি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ধারক। সেই ঐতিহ্যকে আপন কণ্ঠে ধারণ করে দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন চট্টগ্রামের রাউজানের কৃতী লোকশিল্পী, কবিয়াল ও বুদ্ধ কীর্তনশিল্পী রবিশংকর দে রুবেল (রুবেল কান্তি দে)। কবিগান, পাল্টা কীর্তন, বুদ্ধ কীর্তন ও গুরু নিধি কীর্তনের অঙ্গনে তাঁর নাম আজ দুই বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে সুপরিচিত।
দীর্ঘদিন চিকিৎসার জন্য ভারতে অবস্থান করলেও সংগীতচর্চা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি এই গুণী শিল্পী। বরং চিকিৎসার পাশাপাশি ভারতজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশনা করে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। চিকিৎসা শেষে তাঁর সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার খবরে রাউজানসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভক্ত-অনুরাগী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে আনন্দের আবহ সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৮৩ সালের ৩ জুন চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের সরকার পাড়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রবিশংকর দে রুবেল। তাঁর পিতা কাজল কান্তি দে এবং মাতা আলো রানী দে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগের পাশাপাশি ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন ও আধ্যাত্মিক চর্চায় নিজেকে নিবেদিত করেন। সেই সাধনাই তাঁকে পরবর্তীতে কবিগান, পাল্টা কীর্তন ও বুদ্ধ কীর্তনের অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে।
সংগীতজীবনের শুরুতে তিনি প্রখ্যাত কবিয়াল শামসুল আলমের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পরে বুদ্ধ কীর্তনের শাস্ত্রীয় শিক্ষা লাভের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের নারিচ্ছা-আমিরাবাদের বিশিষ্ট বুদ্ধ কীর্তনীয়া কীর্তন নিধি বিমল বড়ুয়ার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কাছ থেকে বুদ্ধ কীর্তনের শাস্ত্রীয় জ্ঞান ও পরিবেশনার দীক্ষা অর্জনের মাধ্যমে শিল্পীজীবন আরও সমৃদ্ধ হয়।
চিকিৎসাকালীন সময়ে ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার রাধানগর, জগরটিলা, বেলুনিয়া, কল্যাণনগর, সাবরুম ও উদয়পুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বেহালা সত্যনন্দা মহাথের বিহার, চাকলা ও বেরাচাঁপাসহ একাধিক স্থানে পাল্টা কীর্তন ও বুদ্ধ কীর্তন পরিবেশন করেন তিনি। তাঁর সুমধুর কণ্ঠ, শুদ্ধ উচ্চারণ, সাবলীল উপস্থাপনা ও আধ্যাত্মিক পরিবেশনা দুই বাংলার দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে এবং ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসা শেষে বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছুদিন বিশ্রাম শেষে আবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মঞ্চে কবিগান, পাল্টা কীর্তন ও বুদ্ধ কীর্তনের পরিবেশনা নিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের সামনে হাজির হবেন।
প্রিয় শিল্পীর দেশে ফেরার খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের বার্তা জানাচ্ছেন অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী। অনেকেই আশা প্রকাশ করেছেন, আগের মতোই তিনি আবারও বাংলার লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
দেশে ফিরে অনুভূতি প্রকাশ করে কবিয়াল রবিশংকর দে রুবেল বলেন, “আপনাদের ভালোবাসা ও আশীর্বাদে আমি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছি। খুব শিগগিরই চেনা মঞ্চে, চেনা সুরে ও ছন্দে আবারও আপনাদের সামনে হাজির হব। সকলের দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করছি।”
বাংলার হাজার বছরের লোকঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে নিরলসভাবে কাজ করে চলা এই শিল্পীর প্রত্যাবর্তন শুধু তাঁর ভক্তদের জন্য নয়, বরং দেশের লোকসংস্কৃতি অঙ্গনের জন্যও একটি আনন্দের সংবাদ। সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা, সুস্থ হয়ে নতুন উদ্যমে আবারও সুরের মূর্ছনায় মাতিয়ে তুলবেন দেশের মঞ্চ, আর দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবেন তাঁর কণ্ঠের জাদুতে।
মন্তব্য করুন